কমেডির আড়ালে কমেডিয়ানের ট্রাজেডি

কল্পনা করুন একজন মানুষ মঞ্চে উঠছে। তার মুখে আলো পড়ছে, সে হাঁসছে, দর্শকও হাঁসছে। কয়েক সেকেন্ড পর, সেই লোকটাকেই টেনে নামিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। কারণ? সে হাসিয়েছে। হ্যাঁ, ঠিক-সে কাউকে মেরেওনি, জ্বালাও-পোড়াও করেওনি। সে শুধু ঠাট্টা করেছিল।

এই ঘটনা কল্পনা নয়। এটা মুনাওয়ার ফারুকির বাস্তব জীবন। মঞ্চে উঠার আগেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। অভিযোগ? এমন কৌতুকের জন্য, যা সে বলেওনি। শুধু গুজব রটেছিল, সে নাকি ঈশ্বর নিয়ে ঠাট্টা করতে চলেছে। ব্যস! গ্রেপ্তার, জেরা, ট্রোল, অনুষ্ঠান বাতিল, পরিবারের উপর চাপ সব কিছু একসাথে।

এই মুনাওয়ার একা না। ভাবুন কতজন কমেডিয়ান আজকাল এমন একটা জীবনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে প্রতিটা ঠাট্টা আগে সমাজ ও রাষ্ট্রের অনুমোদন পেতে হয়? আমাদের ছোটবেলায় তো ব্যঙ্গাত্মক নাটক, কৌতুক, এমনকি টিভির “মীরাক্কেল” পর্যন্ত দেখতাম কত সহজে, আনন্দে, মজা করে। এখন যেন হাসিতেই আতঙ্ক।

একটা ঠাট্টা-টুইটার-ঝড়, মামলা, শো বাতিল, ট্রোলের পাহাড়। কুনাল কামরার “নয়া ভারত” শো নিয়ে রটা খবর পড়েছিলেন? মুম্বাইতে সেই শো হওয়ার আগেই হইচই পড়ে যায়। শুধু নাম শুনেই কেউ কেউ ধরে নেয়-“এই লোক নিশ্চয় দেশবিরোধী কিছু বলবে!” এমন একটা নাম, যা আসলে ছিল ব্যঙ্গ, তা-ই পরিণত হয় অভিযোগে। ঠিক একইভাবে সাময় রায়নার “India’s Got Latent” নিয়েও তুমুল বিতর্ক। বিস্তারিত কী বলেছে সে কে জানে! কিন্তু কিছু না জেনেই “অপমান করেছে”ড়এই অভিযোগ তো চলেই আসে। আর বির দাসের সেই বিখ্যাত “Two Indias” মনোলগ-ওটা তো যেন একটা চপেটাঘাত ছিল, কিন্তু হাতে না, শব্দ দিয়ে। ওটা শুনে কেউ কেউ কেঁদেছে, কেউ কেউ বলেছে “দেশকে অপমান করেছে।”

তবে ব্যাপারটা হচ্ছে কেউই তো মিথ্যে বলছে না। হাসির আড়ালে থাকে এক গভীর সত্য। আর সেই সত্যটাই আসলে চেপে যেতে চায় কিছু মানুষ। কমেডি তো বরাবরই একটা আয়না। সমাজের সামনে রাখা হয়-দেখো, কেমন আচরণ করছো। কিন্তু আয়নায় যদি নিজের মুখ দেখে কেউ না খুশি হয়, তখন সে-ই আয়নাটা ভেঙে ফেলতে চায়। হয়তো জেনে থাকবেন, প্রাচীন গ্রীসের অ্যারিস্টোফেনিস যুদ্ধ, রাজনীতি নিয়ে এমনভাবে ব্যঙ্গ করতেন, যে তার নাটকগুলো এখনও পড়ানো হয়। ৪১১ খ্রিস্টপূর্বে লেখা লিসিসট্রাটা নাটকে তো নারীরা যৌনতা বন্ধ করে দেয় যুদ্ধ থামানোর জন্য! হাস্যকর প্লট, কিন্তু মেসেজ? ভয়ংকর বাস্তব।

ইউরোপে ভাঁড়রা রাজাকে পর্যন্ত ব্যঙ্গ করতেন। তারা জানতেন হাসি মানুষকে চিন্তা করায়। হাসির মাধ্যমে মানুষ সত্য শুনতে নিরাপদ বোধ করে। ভারতেও এমন হয়েছে। বাংলা নাটক, ব্যঙ্গচিত্র, ভারতেন্দুর ভারত দুর্দশা-সবই হাস্যরসের ভিতরে আন্দোলনের ভাষা লুকিয়ে রেখেছে। ব্রিটিশরা যতই কড়া হোক, ঠাট্টার ছদ্মবেশে বিদ্রোহ গোপন থাকত। তাহলে এখন কেন এই ভয়? একটা বড় কারণ হলো সোশ্যাল মিডিয়া। আগে এক ঘরে বলা কৌতুক এক ঘরেই থাকত। এখন? এক মুহূর্তেই ভাইরাল। কোনো প্রেক্ষাপট নেই, শুধু ১০ সেকেন্ডের ক্লিপ। যেটা এক জায়গায় মজার, অন্য কোথাও সেটাই হয়ে যায় “আপত্তিকর”।

আর আমরা তো এখন এমন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে সবাই নিজেদের পরিচয় নিয়ে খুব সচেতন। কেউ ধর্ম নিয়ে ঠাট্টা করলে বলে “অবিশ্বাসী!” কেউ রাজনীতি নিয়ে বললে বলে “দেশদ্রোহী!” আর কমেডির সব চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি কি জানেন? ওটাকে এখন বাধ্য করা হচ্ছে একটা “পক্ষ” নিতে। তুমি হয় “দেশের পক্ষে”, নয়তো “দেশের বিরুদ্ধে।” কিন্তু কমেডি তো কখনো পক্ষ নেয় না। ওতো শুধু দেখিয়ে দেয়-“দেখো, তোমরা তোমরা কত দলে ভাগ হয়ে গেছো।” ও বলে-“এই টানাপোড়েন, এই দ্বন্দ্ব, এটাও সমাজেরই অংশ।”

তবু যতবার আয়নাটা সামনে আসে, কেউ না কেউ সেটা টুকরো করে দেয়। কিন্তু আয়না ভাঙলে কি প্রতিফলন থেমে যায়? না। সোভিয়েত ইউনিয়নে ছিল নিষেধ, নাৎসি জার্মানিতে ছিল ভয়, দক্ষিণ আফ্রিকায় ছিল বিভাজন। কিন্তু সেখানেও কমেডি টিকে ছিল। আমাদের কাছেও থাকবে। কখনো উপমা দিয়ে, কখনো পুতুল দিয়ে, কখনো নিঃশব্দে-কমেডিয়ানরা পারফর্ম করে যাবেই। তারা বীর নয়, বিপ্লবীও নয়। তারা শুধু আমাদের কথা আমাদের ভাষায় বলে দেয়। আর সেই জন্যই-আমরা চাইলেও, কমেডিকে থামানো যাবে না। সত্যকে থামানো যায় না। আর কমেডি? সে তো শুধু হাসায় না, সত্যিটাও বলে-বিলি কেটে, অথবা গর্জে উঠে।






LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন