: আপনি কি গদ্য লেখেন?
: গদ্য আমার ভালো লাগে। মাঝে মাঝে গদ্য এমন এক ধরনের কবিতার গভীরতায় পৌঁছে যেতে পারে, যা কবিতাও পারে না। তবে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, আর আমার কবিতার প্রকল্প এখনও অসম্পূর্ণ। আমার ভেতরে গদ্য আর কবিতার মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা চলে। কিন্তু আমার পক্ষপাত সবসময় কবিতার দিকেই।
: আপনি কীভাবে মেমোরি ফর ফরগেটফুলনেস: আগস্ট, বৈরুত, ১৯৮২ লেখেন? বইটির শুরুতেই আপনি লেখেন, “একটি স্বপ্ন থেকে আরেকটি স্বপ্ন জন্ম নেয়।” এরপর একের পর এক জীবন্ত গদ্য-কবিতার মাধ্যমে অবরুদ্ধ শহরের দৃশ্য ও শব্দ তুলে ধরেছেন। এটা লেখার পেছনে কী ঘটনা কাজ করেছিল?
.: ঘটনাটি ঘটার চার বছর পর আমি বইটি লিখি। তখন আমি প্যারিসে ছিলাম। মাত্র দুই-তিন মাসের মধ্যেই এটি শেষ করি, খুব দ্রুত। সেই সময়ের স্মৃতি, বৈরুতের ছাপ আমাকে পিছু ছাড়ছিল না। আমি কবিতা লিখতেই পারছিলাম না। অনেকটা এখনকার মতো। এই দুঃসহ অবস্থার থেকে মুক্তি পেতেই আমি বইটি লিখি। আমার উদ্দেশ্য ছিল একান্তই ব্যক্তিগত। আমি ঐতিহাসিক ছিলাম না, বিশ্লেষকও না। কেবল নিজের ভেতরের ভার নামাতে লিখেছিলাম। এই লেখার মধ্য দিয়ে আমার লেখকজগতের অচলাবস্থা ভেঙে গেল।
: আপনি তো দুটো সময়ই পার করেছেন, তাহলে সেই সময়ের সঙ্গে এখনকার সময়ের মিল কোথায়?
: বৈরুতের অবরোধ ছিল অনেক বেশি তীব্র ও বিপজ্জনক। সেটি ছিল পুরোনো ধাঁচের যুদ্ধ। শহরের এমন কোনো রাস্তা ছিল না যেখানে বিপদ ছিল না। যারা বেঁচে ফিরেছে, তারা ভাগ্যবান। জীবন ঝুঁকিতে ছিল সবার। আর এখন যা হচ্ছে, তা ধাপে ধাপে ঘটছে। মাঝে মাঝে খুব ভয়াবহ কিছু হয়, আবার কিছু সময় শুধু যন্ত্রণাদায়ক। সবচেয়ে খারাপ সময় এপ্রিল মাসে, আমি ইউরোপে ছিলাম। ফলে সক্রিয় বোমা বর্ষণ, গুলি চলার সময় আমি সেখানেই ছিলাম। এখন অবরোধটাই হয়ে গেছে স্বাভাবিক। যুদ্ধ নেই, গুলি নেই, কিন্তু মানুষ এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে ভাবনার একমাত্র বিষয় হচ্ছে: কারফিউ কখন উঠবে? ময়লা কখন পরিষ্কার হবে? অফিসে যাওয়া যাবে কবে? বিষয়টি এখন আর সংবাদও নয়, বরং নিত্যদিনের জীবনের অংশ। এটাই সবচেয়ে ভয়াবহ। এর কোনো উজ্জ্বল চিত্র আর নেই, মানুষ যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছে। জানি না এই অভিজ্ঞতা কোনো রেকর্ডে থাকবে কিনা। হয়তো কোনো এক সময় লেখার রূপ নেবে গদ্য ও কবিতার সংমিশ্রণে। তবে এখনই না, সময়ের একটি ব্যবধান প্রয়োজন।
.: আপনি কবে প্রথম কবিতা লেখা শুরু করেন?
: ছোটবেলায় আমি দুর্বল ছিলাম, খেলাধুলা করতে পারতাম না, কুস্তি বা ফুটবল খেলায় অংশ নিতে পারতাম না। তাই ভাষার দিকে ঝুঁকে পড়ি। বড়দের সঙ্গে অনেক সময় কাটাতাম। আমার দাদার ঘরে প্রতিবেশীরা জড়ো হয়ে আরবি কাহিনি বলতেন, মাঝে মাঝে কবিতা থাকত। সেই রোমান্টিক গল্পগুলো শুনে আমি গভীরভাবে আন্দোলিত হতাম। যদিও অনেক কিছু বুঝতাম না, তবুও শব্দের ধ্বনি আমাকে স্পর্শ করত। আমি টের পেতাম, ভাষার মধ্য দিয়েই আমার সংকটের সমাধান সম্ভব। তখন থেকেই স্বপ্ন দেখতাম আমি একদিন কবি হব। কবিকে মনে হতো যেন এক রহস্যময়, অতিমানবিক ক্ষমতাসম্পন্ন কেউ!
শৈশবেই কবিতা লিখতে শুরু করি, কিন্তু তখন বুঝিনি যে আমি কবিতা লিখছি। আমার বাবা-মা ও শিক্ষকরা আমাকে উৎসাহ দিতেন। খেলাধুলায় পারতাম না, তাই লেখার মধ্য দিয়েই যেন নিজেকে প্রমাণ করতে চেয়েছি।
.: আপনি কবে থেকে নিজেকে একজন কবি হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে শুরু করলেন?
: না, আমি নিজেকে গুরুত্ব দিই না। আমি কবিতাকে গুরুত্ব দিই। মজার ব্যাপার হলো, প্রথম যিনি আমাকে কবিতার গুরুত্ব বোঝালেন, তিনি ছিলেন গালিলি অঞ্চলের ইসরায়েলি সামরিক প্রশাসক।
আমি তখন ১২ বছর বয়সী। আমাদের গ্রাম ছিল সামরিক শাসনের অধীনে। আমি ক্লাসে প্রথম ছিলাম। ইসরায়েলের স্বাধীনতা দিবসে আমাকে কিছু পড়ে শোনাতে বলা হয়। আমি একটি কবিতা পড়েছিলাম যেটা আমাদের আরব অবস্থান নিয়ে কথা বলছিল। পরদিন সামরিক গভর্নর আমাকে ডেকে পাঠান। তিনি আমাকে তিরস্কার করেন।
আমি তখন একেবারেই নিষ্পাপ ছিলাম। বুঝতে পারিনি সত্য বলা বিপজ্জনক হতে পারে। ভাবলাম এত বড় রাষ্ট্র, আর তারা আমার কবিতায় ক্ষুব্ধ! তাহলে কবিতা নিশ্চয়ই গুরুত্ব রাখে। সত্য বলার এই কাজটাই বিপজ্জনক ছিল।
: আপনি একাই গিয়েছিলেন সামরিক গভর্নরের সঙ্গে দেখা করতে?
এম. ডি.: হ্যাঁ, আমি একাই গিয়েছিলাম। ১২ বছরের একটি ছেলে, যার লেখা একটি কবিতার জন্য সামরিক গভর্নর এতটা ক্ষুব্ধ হয়! ভাবুন!
: আপনার পরিবার কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল?
: তারা একদিকে গর্বিত ছিল, তাদের ছেলে এমন কিছু বলেছে যা তারা নিজেরা বলতে পারেনি, আবার ভয়ও পেয়েছিল আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে। আমি লেখালেখির জন্য অনেক মূল্য দিয়েছি। ১৬ বছর বয়সে প্রথম গ্রেপ্তার হই। এরপরও বারবার কারাগারে যেতে হয়।
তবে আমার মা-বাবা কখনও আমাকে লেখালেখি থেকে বিরত করেননি। পরে আমি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হই। তখন ভাবতাম কবিতা সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার। আমি এটাকে খুব গুরুত্ব দিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু পরে বুঝলাম, কবিতা বাস্তবতা বদলায় না। এটি মানুষের অনুভূতিতে প্রভাব ফেলে, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন আনে না। কবিতা শুধু কবিকেই বদলায়।
তবে আমি নিজেকে সিরিয়াস কবি হিসেবে দেখি না। বরং আমি যত বড় হচ্ছি, আর আমার কবিতাকে যত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, আমি তত বেশি চিন্তিত হয়ে পড়ছি।
: আপনি বলেছেন, কবিতা পরিবর্তনের মাধ্যম নয়। তাহলে আপনি কি মনে করেন, আপনি ফিলিস্তিনি জাতীয় সংগ্রামে কোনো ভূমিকা রেখেছেন?
.: শুরুতে আমার কবিতা ফিলিস্তিনি পরিচয়ের গঠনে ভূমিকা রেখেছিল। কবি ভাষার মাধ্যমে জাতিকে শক্তি দিতে পারেন। মানুষকে আরও মানবিক, সহনশীল করে তুলতে পারেন। আমার কবিতা শোক ও উৎসবে পাঠ করা হয়। কিছু কবিতা গান হয়ে মানুষের মধ্যে আশা জাগায়।
তবে আমার প্রধান লক্ষ্য হলো আমার কবিতা আরবি কবিতাকে কতটা এগিয়ে নিতে পারছে, সেটাই। (সংক্ষেপিত)


