বাংলাদেশে ২০০৭-০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জনগণের প্রত্যাশার চেয়ে জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাদের ভাবনাকে যুক্তরাষ্ট্র বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব ছিল নির্বাচনের সময়সীমার ওপর। ওই সময়ে বাংলাদেশ নিয়ে মার্কিন এই নীতি বড় ভুল ছিল বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপরাষ্ট্রদূত জন ড্যানিলোভিচ। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন গতিপথ’ শীর্ষক আলোচনায় আরও অংশ নেন বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম।
সাবেক কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচের কাছে সঞ্চালক জিল্লুর রহমানের প্রশ্ন ছিল ২০০৭-০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মার্কিন কূটনীতিকদের ভূমিকার বিষয়ে। এ সময় জন ড্যানিলোভিচ জানান, ‘(মার্কিন কূটনীতিক হিসেবে) আমি প্রথম স্বীকার করছি, ২০০৭-০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র বড় ভুল করেছিল। তবে রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া বিউটেনিস (ঢাকায় তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত) কিংবা আমার সহকর্মীরা এক-এগারো ঘটাননি। আমি মনে করি না, কোনো গোপন ‘কফি গ্রুপ’ সিদ্ধান্ত নিয়ে তা বাংলাদেশের জনগণকে বাস্তবায়ন করার নির্দেশ দিয়েছিল।
তখন (সেনাসমর্থিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগে) অবশ্যই বাংলাদেশ যে পথে এগোচ্ছিল, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বেশ কিছু উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ ও সেনাবাহিনীর মতো আমাদেরও লক্ষ্য একই রকম ছিল।’ তিনি বলেন, ‘১৯৯০ সালে গণতন্ত্র নিয়ে যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, তা থেকে বিচ্যুতি ঘটেছিল। ফলে মৌলিক গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রয়োজন ছিল। তাই সংস্কারের এজেন্ডায় আমরা সমর্থন দিয়েছিলাম। আমরা সেনাসমর্থিত সরকারকে সমর্থন দিয়েছিলাম। আমরা সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতাম। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে আমাদের বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা ছিল। বিপুলসংখ্যক জনগণের কণ্ঠস্বরের যে প্রতিফলন হওয়ার কথা ছিল, সে সময়ে তা হয়নি।’
জন ড্যানিলোভিচ বলেন, ‘আমরা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরের গোষ্ঠীসহ অনেকেই জেনারেল ও ব্রিগেডিয়ারদের ভাবনাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলাম। গুরুত্ব দিইনি বাংলাদেশের জনগণ কী চেয়েছিল সে বিষয়ে। আমরা নাগরিক সমাজের সঙ্গে কথা বলতাম। আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা বলতাম। আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গেও কথা বলতাম। হয়তো সেনাবাহিনীর কথাই আমরা বেশি শুনেছিলাম। আংশিকভাবে সম্ভবত সে কারণেই গণতন্ত্রের উত্তরণ নিয়ে যে প্রত্যাশা ছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের দ্বিতীয় ভুলটি ছিল নির্বাচনের সময়সীমার ওপর বেশি জোর দেওয়া। নির্বাচন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের দীর্ঘ সময়ের রায় (ম্যান্ডেট) ছাড়া কোনো সরকার পরিচালিত হতে পারে না। আর নির্বাচিত সরকারকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া উচিত। ওই সময় মৌলিক কিছু সংস্কারের প্রয়োজন ছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংস্কারের এজেন্ডাও এগিয়ে নিচ্ছিল। কিন্তু একটা সময়ে এসে এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে নির্বাচনের আয়োজন করে দায়িত্ব হস্তান্তরই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।’
তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকারের বোঝাপড়াটা হয়েছিল গোপনে। তাই আমাদের জানা সম্ভব ছিল না সাবেক প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) কোন শর্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে আপসরফা করেছিলেন। আমরা এর কোনো পক্ষ ছিলাম না। তখন আমাদের ধারণা হয়েছিল যে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েছিল এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেবেন।’
সাবেক এই মার্কিন কূটনীতিক আরও বলেন, ‘ইতিহাস ভুল প্রমাণ করল। আমরা দেখলাম ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অধোগতি ঘটতে থাকল, যার চূড়ান্ত রূপ দেখলাম ২০২৪ সালের নির্বাচনে।’ জন ড্যানিলোভিচ বলেন-অন্তর্বর্তী সরকার এখন সংস্কারের বিষয়ে যা করছে, তা হলো ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণের প্রতিফলন। এখনকার জটিল পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে যুক্ত করে বেসামরিক সরকারের গুরুত্ব তুলে ধরে বর্তমান সরকার সংস্কারের বিষয়ে যেভাবে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।


