যখন এলভিস প্রিসলির কথা আসে, তখন আপনার মাথায় কী ভেসে ওঠে? হয়তো তার দুলতে থাকা কোমর, লেদার জ্যাকেট, মধুর কণ্ঠ, কিংবা বিখ্যাত পিনাট বাটার আর কলার স্যান্ডউইচের গল্প। এলভিস ছিলেন অনেক কিছু – রক অ্যান্ড রোলের রাজা, আমেরিকার আইকন, পপ কালচারের জগদ্দল পাথর।কিন্তু মিগুয়েল কনারের লেখা নতুন বই The Occult Elvis: The Mystical and Magical Life of the King বলছে, এলভিস ছিলেন আরও অদ্ভুত কিছু: এক টেলিপ্যাথিক অধিদেবতা, যিনি অসুস্থদের সুস্থ করতে পারতেন, আবহাওয়া বদলাতে পারতেন, এমনকি এলিয়েনদের সঙ্গেও যোগাযোগ করতেন!
বিশ্বাস করা কঠিন, তাই না? এলভিস: রকস্টার ছাড়িয়ে আরও কিছু! মিগুয়েল কনার, যিনি গ্নস্টিসিজম নিয়ে কাজ করেন এবং Aeon Byte Gnostic Radio পডকাস্ট চালান, এলভিসকে শুধুমাত্র এক জন সুপারস্টার হিসেবে নয়, বরং ‘পশ্চিমা সভ্যতার সবচেয়ে বড় জাদুকর’ হিসেবে দেখেন। ২০২২ সালে এক আয়াহুয়াস্কা সেরেমনির পর তার এই ধারণা জন্মায় – এলভিস ছিলেন এক সত্যিকারের সত্য-সন্ধানী, যিনি বৃহস্পতির নবম চাঁদ থেকে এসেছিলেন!
আধ্যাত্মিক অভিযানের শুরু
এলভিসের আধ্যাত্মিক দিক নতুন আবিষ্কার নয়। আগেও বেশ কয়েকটি বইতে তার আত্মিক অনুসন্ধানের কথা উঠে এসেছে, যেমন The Tao of Elvis এবং The Seeker King। জানা যায়, এলভিসের ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে ছিল হাজারেরও বেশি বই – ধর্ম, মিস্টিসিজম, নিউ এজ দর্শন নিয়ে। শুধু পড়তেন না, প্রতিটিতে দাগ টানতেন, নোট করতেন, আর নিজের মতো করে ভাবতেন। গ্যারি টিলেরি লিখেছেন, একসময় এলভিস চাইতেন গানের জগত ছেড়ে নিজস্ব এক কমিউন তৈরি করতে, যেখানে তিনি ধ্যান, যোগের মাধ্যমে তরুণদের আধ্যাত্মিক জগতে নিয়ে যাবেন।
এলভিসের অলৌকিক ক্ষমতা!
The Occult Elvis বইতে এলভিসের আরও অদ্ভুত ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। যেমন, একদিন তিনি হাত নাড়িয়ে আকাশ থেকে বৃষ্টি থামিয়েছিলেন যাতে বন্ধুরা গ্রেসল্যান্ডে র্যাকেটবল খেলতে পারে! ভক্ত ওয়ান্ডা জুন হিল বলেন, এলভিস একবার তাকে জানিয়েছিলেন যে তিনি পৃথিবীর বাসিন্দা নন – বরং বৃহস্পতির নবম চাঁদ থেকে এসেছেন! এলভিসের মতে, এলিয়েনরাও তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। একবার তিনি দেহরক্ষী সনি ওয়েস্টকে বলেন, ‘তারা যদি আসে, ভয় পেও না। ওরা আমাদের ক্ষতি করবে না।’
এক অলৌকিক উত্তরাধিকার
কনার এলভিসকে আলিস্টার ক্রাউলির মতো ‘ডার্ক ম্যাজিশিয়ান’ হিসেবে দেখেন – যিনি ‘Do what thou wilt’ নীতিতে বিশ্বাস করতেন। তিনি বলেন, এলভিসের মাধ্যমে রক মিউজিক জন্ম নিয়েছে। এবং সেটাই তার আসল ‘ম্যাজিক’। কনার আরও যুক্তি দেন, এলভিস ছিলেন আমেরিকার ‘এগ্রিগর’ – মানে, অসংখ্য মানুষের ইচ্ছা ও আবেগের সম্মিলিত চেতনা থেকে তৈরি এক অদৃশ্য শক্তি। ছোটবেলা থেকেই এলভিসের জীবনে নানা রহস্যময় ঘটনা ঘটত। তার মৃত যমজ ভাই জেসি নাকি তাকে আধ্যাত্মিকভাবে পথ দেখাতেন। আর একসময় তিনি নিজেকে নাকি আকাশের তারা-মন্ডলে প্রোজেক্ট করতেও পারতেন!
রক অ্যান্ড রোল: এক ধরনের আধ্যাত্মিকতা
এলভিস বেড়ে উঠেছিলেন পেন্টেকস্টাল চার্চের মধ্যে, যেখানে গান, নাচ আর প্রত্যক্ষ ঈশ্বরিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটা শুধু এলভিস নয় – লিটল রিচার্ড, বিবি কিং, জনি ক্যাশ – এদের সবার সংগীতের শিকড়ও ছিল এখানেই। ‘রক সংগীত কেবল বিনোদন ছিল না,’ বলেন কনার, ‘এটা ছিল এক ধরনের শামানিক আধ্যাত্মিকতা।’
চুল কাটতে গিয়ে জীবনের মোড়
১৯৬০ সালে এক বিখ্যাত হেয়ারস্টাইলিস্ট ল্যারি গেলারের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর এলভিসের আধ্যাত্মিক যাত্রা আরও গতি পায়। গেলার তাকে পরিচয় করিয়ে দেন যোগ, ধ্যান, নিউমারোলজি, এলিয়েন দর্শনসহ নানা গোপন বিদ্যার সঙ্গে।
গেলার বলেন, ছোটবেলায় এলভিস এলিয়েনদের স্বপ্ন দেখতেন – সাদা জাম্পস্যুট পরা এক ভবিষ্যতের নিজের ছবি। (ভবিষ্যতে এলভিসের বিখ্যাত পোশাক!) এলভিস ট্যুরে থাকলেও বইয়ের স্তূপ নিয়ে যেতেন। তিনি পড়তেন কাহলিল জিবরানের The Prophet, হেলেনা ব্লাভাটস্কির গূঢ় দর্শন, মানলি পি. হলের গোপন দর্শন নিয়ে বই, আরও কত কিছু! তিনি কারাতে শিখেছিলেন, মঞ্চে তিব্বতী মন্ত্র উচ্চারণ করতেন, গলায় পরতেন মিশরীয় অ্যানখ আর ইহুদি ছাই প্রতীক – এই সবই তার আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের অংশ।
আলোর মুখোমুখি অন্ধকার
একবার, গাড়িতে সফরের সময়, এলভিস আকাশে জোসেফ স্তালিনের মুখ দেখতে পান – যা ধীরে ধীরে যিশুর মুখে রূপান্তরিত হয়। এলভিস অনুভব করেন, অন্ধকার ও আলো দুটোই তার ভেতরে আছে। তিনি বলেন, ‘আমি জানি, এখন আর কোনো সন্দেহ থাকবে না।’ এলভিস এরপর বুঝেছিলেন তার একটি মিশন আছে: মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিকতা ছড়িয়ে দেয়া।
একটি অসমাপ্ত যাত্রা
কিন্তু ১৯৭৭ সালে মাত্র ৪২ বছর বয়সে এলভিস মারা যান। তার হাতে ছিল একটি বই – A Scientific Search for the Face of Jesus। মৃত্যুর পরেও এলভিসকে ঘিরে রহস্য থেকেই যায়। গ্রেসল্যান্ডে এখনও ভক্তরা তার দর্শন পাওয়ার দাবি করেন। কনার মজা করে বলেন, ‘এলভিস এখন সাসকোয়াচ, যিশু আর ভার্জিন মেরির মতো – অদৃশ্য হলেও চিরবিদ্যমান!’ হয়তো, এলভিস শুধু গান নয়, নিজের কিছু জাদুও রেখে গেছেন পৃথিবীতে।


