” … নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস সূর্যের আলো, পানির স্রোত, বাতাস ইত্যাদি। নেট জিরো লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমাদের জোর তৎপরতা থাকা উচিত হলেও, দুঃখজনকভাবে আমরা সেদিকে না গিয়ে এখনও জীবাশ্ম জ্বালানির মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি।
আগের চেয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা বেড়েছে। তা ছাড়া কয়লা নিয়ে অনেক বিতর্ক বলে আমরা আরেক জীবাশ্ম গ্যাস বিশেষত এলএনজির (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) দিকে ঝুঁকছি।
… এর অন্যতম সুফলভোগী হবে আমেরিকা। ইতোমধ্যে এক্সিলারেট এনার্জি, কাতার এনার্জি এবং ওকিউ ট্রেডিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানি চুক্তি করেছে। পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কেনা হচ্ছে। গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্জেন্ট এলএনজির সঙ্গে ২৯ বছর মেয়াদি একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে, যাতে বাংলাদেশ প্রতিবছর ৫০ লাখ টন এলএনজি কিনবে।
… এলএনজি আমদানি, মজুত ও বিতরণের অবকাঠামো বাংলাদেশে নেই। তাই বিদেশি ঋণ ও কোম্পানির সাহায্যে বিশেষ অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। ইতোমধ্যে সামিট গ্রুপ ও এক্সিলারেট এনার্জি দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) বসিয়েছে, যার প্রতিদিন ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস মজুত করার ক্ষমতা আছে। এ জন্য প্রতিবছর প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানি করতে হয়।
… পরিহাসজনক হলো, আমরা (জ্বালানি নীতিতে) অঙ্গীকার করেছি জ্বালানি স্থানান্তর অর্থাৎ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাব। অথচ জীবাশ্ম জ্বালানি এলএনজির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াচ্ছি।
অঙ্গীকার অনুযায়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রণোদনা দিলে, সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করলে এর প্রসার ঘটত এবং জ্বালানি-স্বনির্ভরতাও বাড়ত।
জ্বালানি-স্বনির্ভরতার দিকে না গিয়ে আমরা জ্বালানি কোম্পানি ও সরবরাহকারী দেশগুলোর স্বার্থে শক্তিশালী দেশগুলোর ক্রীড়নকে পরিণত হচ্ছি! আর শক্তিধর দেশগুলোও এলএনজিকে নতুন ঔপনিবেশিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
… বিদ্যুতের প্রায় সবটাই কয়লা, গ্যাস ও তেলের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপাদিত হয়। এ ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিমাণ মাত্র ৪% মতো। অথচ অঙ্গীকার অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০%, ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০% এবং ২০৫০ সালের মধ্যে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাস্তবায়ন করতে হবে।
… তা না করে এলএনজির অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় সার্বক্ষণিক বৈদেশিক মুদ্রার চাপে থাকতে হবে, তা যে কেউ অনুভব করতে পারেন।
… উল্লিখিত এলএনজি ক্রয়চুক্তির কারণে বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রনায়করা আমাদের বাহবা দিতে শুরু করেছে। এই বাহবা যে তাদের স্বার্থ রক্ষা করার কারণে মিলছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
… দেশ দখলের পরিবর্তে আজ চলছে ব্যবসা তথা অর্থনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ।…বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে যেখানে জ্বালানি খাত আমদানিনির্ভর, এলএনজি বর্তমানে একটি নতুন ‘জ্বালানি পণ্য’ হিসেবে আবির্ভূত।…একেবারে ঔপনিবেশিক হাতিয়ার, যা আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলতে উদ্যত। “


