একসময় যুগোস্লাভিয়া দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের এক বিস্তৃত ভূখণ্ডজুড়ে ছড়িয়ে থাকা একটি সমাজতান্ত্রিক ফেডারেশনের নাম ছিলো। নাম থেকেই বোঝা যায় এটি ছিল ‘দক্ষিণ স্লাভদের দেশ’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মার্শাল টিটোর নেতৃত্বে সার্ব, ক্রোট, বসনিয়ান, স্লোভেন, মেসিডোনিয়ান, মন্টেনেগ্রিন এ ছয়টি জাতিগোষ্ঠী এক ছাতার নিচে এল। প্রশ্ন থেকেই যায়এক হওয়ার সিদ্ধান্তটা আদৌ টেকসই ছিল? যখন শক্ত হাতে টিটো দেশটাকে সামলে রেখেছিলেন, তখন হয়তো জাতিগত দাঙ্গা ছিল না, কিন্তু বিভেদের বীজগুলো শিকড় গেড়ে বসছিল নিঃশব্দে।
কল্পনা করুন এক বাড়িতে ছয় ভাই থাকে, প্রত্যেকেই ভিন্ন ধর্মে বিশ্বাস করে, ভিন্ন ভাষায় কথা বলে, আর একে অপরকে শতাব্দীজুড়ে সন্দেহ করে এসেছে। যুগোস্লাভিয়াও ছিল অনেকটা সেরকমই। সার্বরা ছিল মূল রাজনৈতিক শক্তি, যারা অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক দিয়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী।অন্যদিকে ক্রোটরা ছিল ক্যাথলিক ও ইউরোপমুখী। বসনিয়ান মুসলিমরা ছিল তৃতীয় স্তরের মতো অবহেলিত। এই জাতিগত পার্থক্য শুধু নামেই ছিল না ধর্ম, ভাষা, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা সবকিছু মিলিয়ে একধরনের সাংস্কৃতিক আগুনের গোলক বানিয়েছিল দেশটা। আর এই আগুনে আগুন লাগাতে রাজনীতিকরাও দেরি করেননি।
১৯৮০ সালে টিটো মারা যাওয়ার পর, যেন সুতো কেটে গেলো। তার আগেই অনেক সমস্যার চাপা সংকেত ছিল,আর্থিক দুর্দশা, দুর্নীতিগ্রস্ত মবোক্র্যাসি, জাতিগত দাঙ্গার ভয়। কিন্তু তার মৃত্যু নতুন এক যুগ আনল, যেখানে কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হয়ে গেলো আর আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ শক্ত হয়ে উঠতে থাকলো। এই সময় সার্ব নেতাদের নেতৃত্বে শুরু হলো “বড় সার্বিয়া” গঠনের স্বপ্ন। অন্যদিকে ক্রোট ও স্লোভেনরা চাচ্ছিল স্বাধীনতা। বসনিয়ান মুসলিমরা পড়ে গেল মাঝখানে, তারা নাতো পুরোপুরি সার্ব, নাতো ক্রোট, ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তও তারা।
৯০-এর দশকে, একের পর এক প্রদেশ স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করতে লাগল। আর শুরু হলো ভয়াবহ যুদ্ধ। স্লোভেনিয়া তুলনামূলক শান্তিপূর্ণভাবে আলাদা হয়ে গেলেও, ক্রোয়েশিয়া ও বসনিয়ায় রক্তগঙ্গা বইতে লাগল। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ১৯৯৫ সালে বসনিয়া যুদ্ধের সময়। স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যায় সার্ব বাহিনী ৮,০০০ এর বেশি মুসলিম পুরুষ ও কিশোরকে হত্যা করে। এই গণহত্যা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় নৃশংসতা। যুদ্ধের সময় ধর্ষণকে ব্যবহার করা হয়েছিল যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে, বিশেষত বসনিয়ায়। নারীর শরীর হয়ে উঠেছিল প্রতিশোধ ও আধিপত্যের মাঠ।
এই সংঘর্ষকে থামাতে জাতিসংঘ এবং পরে ন্যাটো হস্তক্ষেপ করে। বসনিয়ায় ন্যাটোর বোমাবর্ষণ এবং ডেটন অ্যাকর্ডের মাধ্যমে একরকম যুদ্ধ বন্ধ হয়। কিন্তু এও প্রশ্ন থেকে যায় এই হস্তক্ষেপ কি নিছক মানবতা রক্ষার জন্য, না কি ইউরোপের দরজায় এক অনিয়ন্ত্রিত আগুন বন্ধ করার কূটনৈতিক খেলা?
যুগোস্লাভ যুদ্ধ আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ব্যবস্থারও একটি পরীক্ষা ছিল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ICTY (International Criminal Tribunal for the former Yugoslavia) গঠন করা হয় । স্লোবোদান মিলোসেভিচ সহ বহু নেতা বিচারের মুখোমুখি হয়।
আজকের দিনে, যুগোস্লাভিয়ার জায়গায় আমরা দেখি সাতটি স্বাধীন রাষ্ট্র—স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, সার্বিয়া, মন্টেনেগ্রো, উত্তর মেসিডোনিয়া, ও কসোভো যাদের স্বীকৃতি এখনো বিতর্কিত। দেশগুলো তাদের নিজ নিজ পথ খুঁজছে। কেউ ইউরোপীয় ইউনিয়নে ঢুকেছে, কেউ দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক মন্দার সঙ্গে আজও লড়ছে ।
যুদ্ধের ভেতরেও মানুষের সৃজনশীলতা থেমে থাকেনি। ৭০–৮০-এর দশকে যুগোস্লাভ রক সংগীত ছিল এক ধরনের সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ। Bijelo Dugme, EKV, Azra এইসব ব্যান্ড ছিল আইডেন্টিটির প্রতীক, যেখানে জাতিগত পরিচয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে এক নতুন যুব সমাজ গড়ে উঠছিল। যুদ্ধ যখন শুরু হয়, এই শিল্পীরা কেউ কেউ রুখে দাঁড়ায়, কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়, কেউ চুপসে যায়। কিন্তু ইতিহাসে তারা একটা সম্ভাব্য ‘অন্য যুগোস্লাভিয়া’-র বড় চিহ্ন রেখে গেছে।
বসনিয়ার রক্তক্ষয়ের কয়েক বছর পর ১৯৯৮–৯৯ সালে আবার আগুন জ্বলে ওঠে কসোভো প্রদেশে। আলবেনীয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই অঞ্চলে স্বাধীনতার দাবি বাড়তে থাকে, আর সার্ব বাহিনী সেখানে দমন নীতি চালায়। এর জবাবে ন্যাটো সরাসরি সার্বিয়ার উপর বিমান হামলা শুরু করে। এই হামলার ফলে সার্বিয়ার জনগণের মনোজগতে একধরনের আত্মরক্ষা বনাম বঞ্চনার মানসিকতা তৈরি হয়, যার ছায়া আজও রাজনীতিতে বর্তমান। সার্বিয়াকে তারা মনে করে অবাঞ্ছিত এবং কসোভোর স্বাধীনতা এখনো স্বীকৃতি দেয়নি।
আজকের যুগোস্লাভ-উত্তর রাষ্ট্রগুলোর তরুণ প্রজন্ম যুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে বড় হয়নি। তারা বড় হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বপ্ন, টিকটকের ট্রেন্ড, আর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। কিন্তু এক অদ্ভুত দ্বিধায় থাকে তারা একদিকে অতীতের রক্তাক্ত ইতিহাস, অন্যদিকে একটি ঐক্যবদ্ধ, সুস্থ সমাজের আকাঙ্ক্ষা। বসনিয়ার মুসলিম তরুণরা এখনও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, সার্ব তরুণরা নিজেদের পরিচয় নিয়ে দ্বিধায় থাকে, আর ক্রোট তরুণরা ইউরোপের অংশ হতে চায়। কেউ কেউ আবার বলে, “আমাদের সময়কার যুগোস্লাভিয়া থাকলে আমরা সবাই একসাথে বাস করতাম”।
যুগোস্লাভিয়ার ভাঙন ইতিহাসের বইয়ে একপাক্ষিক রাজনৈতিক ঘটনাপঞ্জি নয়, বরং সেটা মানব সম্পর্ক, সংস্কৃতি, ট্র্যাজেডি আর স্বপ্নভঙ্গের গল্প।তা না হলে কীভাবে একসময়কার একটি সফল মাল্টিন্যাশনাল রাষ্ট্র একে একে এতগুলো টুকরোয় ভেঙে যায়?


