নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার একটি দুর্লভমানসিক অবস্থা তবে নার্সিসিস্টিক ব্যক্তিদের সাথে নিয়ে সম্পর্ক থাকা খুবই সাধারণ ব্যাপার। এই রোগটি অহংকার, বড়ত্ববোধ, সহানুভূতির অভাব, সুযোগসন্ধানিতা, আগ্রাসন এবং প্রতিনিয়ত প্রশংসা ও সম্মানের প্রয়োজনীয়তা দ্বারা চিহ্নিত। তবে এই রোগের কিছু অদৃশ্য দিকও আছে যা প্রথম দিকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হতে পারে।ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং নার্সিসিজমের গবেষক অমি ব্রুনেল বলেন “আমরা প্রথম দিকে নার্সিসিস্টদের প্রতি আকৃষ্ট হই, তারা চমকপ্রদ, মজাদার, প্রাণবন্ত! কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তাদের নেতিবাচক গুণাবলী বের হয়ে আসে।”
ব্রুনেল ব্যাখ্যা করেন, নার্সিসিস্টরা “নিজেকে কেন্দ্র করে চিন্তা করেন, তারা অধিকারী, এবং প্রায়ই তারা মনে করেন যে পৃথিবী তাদের চারপাশে ঘোরে।” তবে সবার মধ্যে এটি এক রকম প্রকাশ পায় না। তিন ধরনের নার্সিসিজমের বর্ণনা করা হয়েছে, এজেন্টিক নার্সিসিজম, কমিউনাল নার্সিসিজম, এবং ভলনারেবল নার্সিসিজম। এজেন্টিক নার্সিসিজম সবচেয়ে পরিচিত এবং ক্ষতিকর ধরনের। এই ধরনের নার্সিসিস্টরা নিজেদের কৃতিত্ব ও বুদ্ধিমত্তার ব্যাপারে অত্যধিক আত্মবিশ্বাসী এবং অন্যদের তুলনায় নিজেকে অনেক উচ্চতর হিসেবে দেখেন। তারা নিজেদের ইমেজ রক্ষা করতে অন্যদের ক্ষমতা ও মনের অবস্থানকে তুচ্ছ মনে করেন। তারা আত্মপ্রচার করতে সদা তৎপর, বড় বড় স্বপ্ন দেখেন, এবং প্রাধান্য বজায় রাখার জন্য কাজের পরিবেশে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী।
কমিউনাল নার্সিসিজম ভিন্ন ধরনের, যেখানে এই ব্যক্তিরা অন্যদের সাহায্য করার মাধ্যমে প্রশংসা ও আদর অর্জন করতে চান। তারা খুব সহানুভূতিশীল ও সাহায্যকারী হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করেন, তবে এর পিছনে তাদের আসল উদ্দেশ্য থাকে আরও ভালোবাসা ও প্রশংসা পাওয়ার বাসনা। ভলনারেবল নার্সিসিজম সবচেয়ে দুর্বল ধরনের। এখানে ব্যক্তিরা গভীর নিম্নমানবিকতাবোধের জন্য আত্মবিশ্বাসের অভাব বোধ করেন এবং নানা ধরনের মানসিক অসন্তোষে ভোগেন। তারা খুব রক্ষণশীল, উদ্বিগ্ন, এবং বিষণ্ণ থাকতে পারেন। নার্সিসিজমের কারণ অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। তবে এই বিষয়ক গবেষণা এখনও খুব শক্তিশালী নয়। গবেষকরা সাধারণত মনে করেন যে নার্সিসিজম মূলত পরিবেশগত কারণেই তৈরি হয়, বিশেষত পরিবারের আচরণের কারণে।
অনেক সময় অত্যধিক প্রশংসা, অত্যধিক পিতামাতার প্রীতির ফলে একটি শিশু বড় হয়ে অহংকার ও অহংকারপূর্ণ মনোভাব তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে যদি শিশুকে অবজ্ঞা করে বা তাদের মনোভাব অবমূল্যায়ন করে তবে শিশুটি ভলনারেবল নার্সিসিজমে আক্রান্ত হতে পারে। একজন ব্যক্তি যদি কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত হন, তবে তিনি হয়তো সচেতনভাবে সেটি পরিবর্তন করতে চান। কিন্তু নার্সিসিস্টরা নিজেদের বিশেষত্বের উপর এতটাই বিশ্বাসী থাকেন যে তারা পরিবর্তন চায় না। তারা জানেন যে অন্যরা তাদের বিরক্তিকর মনে করে, তবে তারা এটি নিজেদের ভুল হিসেবে মনে করে না বরং মনে করে অন্যরা তাদের প্রতি ঈর্ষান্বিত।
তবে কিছু গবেষণা দেখায় যে, নার্সিসিজমের কিছু অংশ পরিবর্তন হতে পারে। ২০১৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, যদি নার্সিসিস্টদের কাউকে সহানুভূতি বা ভালবাসা প্রদর্শন করতে বলা হয়, তবে তারা কিছু সময়ের জন্য তাদের আচরণে পরিবর্তন আনতে পারে। নার্সিসিস্টদের সাথে সম্পর্ক রাখা কঠিন হতে পারে, তবে এটি কিছু ক্ষেত্রে উন্নত করা সম্ভব। তবে এসব আলোচনা প্রায়শই যন্ত্রণার মধ্যে শেষ হয়। ব্রুনেল বলেন, অনেক সময়, সেরা উপায় হলো সম্পর্কটি সমাপ্ত করা। যদি কোনও সম্পর্ক মানুষের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে থাকে, তাহলে সেটি অবিলম্বে শেষ করা উচিত। নর্ষিসিস্টিক সম্পর্কের সাথে জীবনের যাত্রায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো নিজের ক্ষমতাকে বুঝে নেয়া এবং আগের ভুলগুলি থেকে শিক্ষা নেয়া।


