বাংলাদেশে নারী দিবসও প্রকৃতপক্ষে নারীদের জন্য নয়। কোনো দিনই ছিলো না। ঠিক এই কারণেই আন্তর্জাতিক নারী দিবস আমাদের জন্য আরও জরুরি হয়ে ওঠেড়এর তাৎপর্য আরও গভীর হয়। আগামীকাল (৮ মার্চ) বিশ্বব্যাপী ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে নারীদের অর্জন উদযাপিত হবে। এটি এমন একটি দিন, যা লিঙ্গসমতার পথে অগ্রগতির হলেও আমাদের হতাশাজনক পর্যালোচনা করার সুযোগ দেয় এবং নারীদের মুখোমুকি হওয়া চ্যালেঞ্জগুলোর বিষয়ে সচেতনতা বাড়ায়। কিন্তু বাংলাদেশে নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার ক্রমবর্ধমান হার নারী দিবসকে কেবল উদযাপনের বিষয় রাখেনি, এটি এখন একটি নিরবচ্ছিন্ন লড়াইয়ের একটি কঠোর স্মারক। যেখানেও নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও সমঅধিকারের জন্য আমাদের লড়তে হয়।
গত এক বছরে বাংলাদেশের নারী অধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো এত ভয়াবহ চিত্র এঁকেছে। “ভয়াবহ” শব্দটিও হয়তো এর জন্য যথেষ্ট নয়। নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ২,৩৬২ নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছেনড়এর মধ্যে ১,০৩৬ জনই শিশু। তাদের মধ্যে ৪৮৬ জন নিহত হয়েছেন, অর্থাৎ প্রতিদিন অন্তত একজন নারীকে হত্যা করা হয়েছে। ২০২৪ সালের প্রথম ১১ মাসে ১৮৬ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন (প্রতি দুই দিনে একজন), ১৩টি গণধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, এবং ৩ জনকে হত্যা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি জানিয়েছে, কেবল ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই ১৮৬টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছ। যার মধ্যে যৌন নির্যাতন ও হয়রানি অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি, কারণ অনেক ঘটনা রিপোর্টই করা হয় না। গতকালই আমরা তিন বছর বয়সী এক শিশুকেও ধর্ষণ হতে দেখেছি এবং আমাদের জন্য এটা নতুনও নয়। দেশের প্রতিটি নারীই এখন আতঙ্কে। বাংলাদেশের নারীদের জন্য এই সহিংসতা কেবল ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়, এটি সামাজিক ব্যাধি। সাংস্কৃতিক রীতিনীতির কারণে অনেক নারী নির্যাতনের বিষয়ে চুপ থাকতে বাধ্য হন এবং যারা সাহায্য চান, তাদেরকে সামাজিকভাবে লজ্জিত করা হয়।
এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে ৬ মার্চের ঘটনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এক ব্যক্তি এক নারীকে মৌখিকভাবে হয়রানি করায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, কিন্তু পরে একটি দল থানায় ভিড় করে তার মুক্তি দাবি করে এবং উল্টো অভিযোগকারী নারীর বিরুদ্ধেই ডাকাতি বা মানহানির অভিযোেগ আনার চেষ্টা করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন জাগে, “এই দেশে অভিযোগ 66 করে আদৌ কোনো লাভ আছে?” এই সংস্কৃতি, যেখানে ভুক্তভোগীদের কণ্ঠ রুদ্ধ করা হয়, এটি নির্যাতনের প্রকৃত ব্যাপকতা নির্ধারণকে আরো কঠিন করে তোলে। নারীর প্রতি সহিংসতার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো ‘নারী বনাম নারী’ আচরণ, যেখানে নারীরাই অন্য নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বা বৈষম্যমূলক আচরণে লিপ্ত হন।
এটি বিভিন্নভাবে দেখা যায়। ধরুন, গালিগালাজ, মানসিক নির্যাতন থেকে শুরু করে পিতৃতান্ত্রিক নিয়মকানুন বজায় রাখার জন্য চুপ করে থাকা পর্যন্ত। কিছু ঘটনা সহজে ভুলবার নয়। যেমনড়এক তরুণী যখন রেলস্টেশনে জিন্স পরেছিলেন, তখন এক নারীই প্রথম তাকে আক্রমণ করেন এবং পরে জনতা মিলে তাকে হয়রানি করে। কিংবা বাসে এক রক্ষণশীল নারী এক কিশোরীকে বলছিলেন, “তোমাদের পোশাকের কারণেই তো দেশে এত ধর্ষণ হচ্ছে!” এ ধরনের আচরণ অনেক সময় ‘অভ্যন্তরীণ নারীবিদ্বেষ’ থেকে আসে। যেখানে নারীরা সমাজের শেখানো নিয়ম মেনে চলে এবং নিজেরাই ক্ষতিকর চর্চাগুলোর ধারক হয়ে ওঠেনড়যেমন বাল্যবিবাহ, যৌতুকের দাবি বা নারীর ওপর নির্যাতনের দায় নারীদের ওপর চাপানো। অনেক ক্ষেত্রেই এমন নারীরা নিজেরাই কোনো না কোনো সময় নিপীড়নের শিকার হয়েছেন এবং অবচেতনভাবে সেই কষ্ট পরবর্তী প্রজন্মের ওপর চাপিয়ে দেন।
এর ফলাফল একটি চক্র হয়ে ফিরে আসে, যেখানে সহিংসতা ও দমননীতি টিকে থাকে। এটি ভাঙতে হলে কেবল আইন পরিবর্তন করলেই হবে না বরং নারীদের মধ্যেও যে বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামো নারীবিদ্বেষকে টিকিয়ে রাখছে, তাকেও চ্যালেঞ্জ করা প্রয়োজন। নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার সামাজিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাকে ব্যাহত করে এবং অন্যায়ের সংস্কৃতি তৈরি করে। যখন নারীরা নিজের বাড়িতেও নিরাপদ নন, কর্মস্থলে বা রাস্তায় চলাফেরা করতে ভয় পান, তখন শুধু তাদের জীবনই নয়, বরং সমগ্র জাতির অগ্রগতিই বাধাগ্রস্ত হয়।


