১৯৫২ সাল। বাংলা চলচ্চিত্র তখনও সত্যজিৎ রায়ের “পথের পাঁচালি” বা মৃণাল সেনের ফর্ম ভাঙার যুগে প্রবেশ করেনি। ঠিক এই সময় তরুণ চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক, তৈরি করে ফেললেন এক সাহসী সিনেমা “নাগরিক”। ছবিটি তৈরি হলেও সেই সময় মুক্তি পায়নি।পরিচালক জীবদ্দশায় ছবিটি হারিয়ে যায় মানুষের চোখ থেকে এবং অনেকের ধারণা ছিল এটি হয়তো আর ফিরে আসবে না।
ঋত্বিক ঘটক ছিলেন শুধু চলচ্চিত্রকার নন, তিনি ছিলেন এক ট্র্যাজিক দার্শনিক, এক শিল্পী যিনি নিজের দেশভাগজনিত ক্ষতবিক্ষত চেতনার মধ্য দিয়েই ভাষা খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁর জীবনের প্রধান অনুপ্রেরণা ছিল পূর্ব বাংলার বাস্তবতা, গৃহহীনতা, পরিচয়ের সংকট ও জাতিগত ব্যথা। নাগরিক ছিল তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, যেখানে কলকাতার এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনের ভাঙন, স্বপ্নভঙ্গ ও এক যুবকের ব্যক্তিগত সংগ্রাম ধরা পড়ে।
নাগরিক-এর মূল চরিত্র রামু এক তরুণ বেকার যুবক, যার পরিবার দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ (অধুনা বাংলাদেশ) থেকে কলকাতায় চলে আসে। নতুন শহরে তারা একটা ভালো জীবনের স্বপ্ন দেখে, কিন্তু ধীরে ধীরে শহরের নির্মম বাস্তবতায় তারা বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে।
রামুর পরিবার তার বাবা, মা এবং ছোট বোন একসঙ্গে একটি জরাজীর্ণ বাসায় থাকে। বাবা একসময় চাকরি করতেন, কিন্তু এখন অবসরপ্রাপ্ত ও রোগাক্রান্ত। মায়ের কাঁধেই সংসারের ভার। রামু কাজ খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত, কিন্তু প্রতিবারই তার স্বপ্ন গুঁড়িয়ে যায়।তার মুখে লেগে থাকে এক ধরনের শূন্যতা ও অনিশ্চয়তা।
রামুর জীবনে একমাত্র আশার আলো হলো তার প্রেমিকা সুভাষিনী। সে রামুর প্রতি সহানুভূতিশীল, দৃঢ়চেতা ও ভালোবাসায় বিশ্বাসী। কিন্তু সামাজিক বাস্তবতা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্কেও ছায়া ফেলে। রামু নিজেকে তার যোগ্য মনে করে না। এমনকি ভালোবাসার মাঝেও সে বারবার হেরে যায় জীবনের কাছে।
ছবির আবহজুড়ে যে শহরটিকে আমরা দেখি তা কখনো সুস্পষ্ট নয়, কিন্তু সবসময় অনুভবযোগ্য। শহর এখানে হয়ে উঠেছে এক অদৃশ্য প্রতিপক্ষ, যেখানে মানুষের মুখগুলো একঘেয়ে, শব্দগুলো কোলাহলপূর্ণ, ভবিষ্যৎ যেন এক কুয়াশাচ্ছন্ন গলি।
রামুর বাবা মারা যান, সংসারে অনাহার দেখা দেয়। মা নিজের গয়নাগাটি বিক্রি করে সাময়িক রেহাই আনেন। কিন্তু এই দুঃসহ বাস্তবতায় কারও মুখেই কোনো দীর্ঘস্থায়ী আনন্দ নেই।
রামু মাঝে মাঝে কল্পনায় ঢুকে পড়ে নিজেকে সফল চাকুরে ভাবে, সুভাষিনীর সঙ্গে সুন্দর জীবনের কল্পনা করে। কিন্তু প্রতিবারই সে বাস্তবতায় আছড়ে পড়ে।
ঘটকের নির্মাণশৈলীতে এই স্বপ্নদৃশ্যগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোতে বাস্তব আর কল্পনা পরস্পরের ওপর চাপে তৈরি হয় এক ধরণের অস্থির দৃশ্যভাষা, যা রামুর মনোজগৎ প্রকাশ করে।
শেষদিকে, রামু একটি ছোট চাকরি পায়। তা খুবই সামান্য হলেও কিন্তু এটিই যেন তার জীবনের একমাত্র ধাক্কাহীন মোড়। ছবির শেষ দৃশ্যে রামু শূন্য দৃষ্টিতে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকে।
ছবিটি এখানেই শেষ হয়। কোনো দৃশ্যমান সমাধান বা আশার আলো দেওয়া হয়নি। বরং রামু ও তার পরিবারের জীবন প্রতিদিনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই বয়ে চলে, যা ছিল ঘটকের দৃষ্টিতে পূর্ববঙ্গ থেকে আগত উদ্বাস্ত্ত মধ্যবিত্তদের অস্তিত্বচিত্র।
নাগরিক একটি পারিবারিক কাহিনি হলেও কিন্তু তার ভেতরে লুকানো আছে সমাজ, রাজনীতি ও অস্তিত্বের গভীর প্রশ্ন। রামু এখানে একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি না, বরং এক সমস্ত প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতীক, যারা শহরের মাটি চেনে না, সমাজে জায়গা পায় না, কিন্তু প্রতিদিন লড়াই করে টিকে থাকার জন্য। ঘটকের ভাষায় এই ছবির গল্প হলো ‘মানুষ না হয়ে ওঠার গল্প’।
ঘটকের ভাষা কখনও প্রচলিত ক্ল্যাসিক সিনেমার মতো নয়। তাঁর ক্যামেরা কখনও স্থির থাকে না, দৃশ্যায়ন হয় রুক্ষ, সংলাপ হয় গভীর ও প্রতীকধর্মী। এই ছবিতে আমরা দেখি বাস্তবতার সঙ্গে কল্পনার এক বিচিত্র সম্মিলন, যেখানে শহর নিজেই হয়ে উঠেছে এক চরিত্র, এক নীরব শত্রু।
“নাগরিক” ১৯৫২ সালেই তৈরি হলেও কিন্তু কোন প্রযোজক বা পরিবেশক এটি মুক্তি দিতে রাজি হননি। এর পেছনে একাধিক কারণ ছিল, ছবির রূঢ় বাস্তবতা মূলধারার বিনোদনধর্মী দর্শকের অনুকূল ছিল না, ঋত্বিক তখনও পরিচিত নাম ছিলেন না, বাজেট স্বল্পতা ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতায় ছবিটি ছিল অনেকাংশে অপরিণত। এইসব মিলিয়ে “নাগরিক” এক ধরণের কালচারাল আর্কাইভে চাপা পড়ে যায়।পরবর্তীতে ঘটক নিজেও ছবির মুক্তির চেষ্টা বাদ দেন।
১৯৭৬ সালে ঘটকের মৃত্যুর এক বছর পর, তাঁর ছাত্র ও অনুরাগীরা ছবির প্রিন্ট ও নেগেটিভ খুঁজে বের করেন। তখন শুরু হয় পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া। যদিও ফিল্মটির অনেক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত ছিল, তবুও সেটিকে যতটুকু সম্ভব পরিস্কার করে ১৯৭৭ সালে মুক্তি দেওয়া হয় কলকাতার নিউ এম্পায়ার সিনেমা হলে। এই ঘটনার ফলে “নাগরিক” এক ‘লস্ট মাস্টারপিস’ হিসেবে চলচ্চিত্র ইতিহাসে নতুন আসনে বসে।এর সঙ্গে সঙ্গেই ঋত্বিকের প্রারম্ভিক ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গির একটি পূর্ণ রূপরেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
“নাগরিক” কেন গুরুত্বপূর্ণ?
“নাগরিক” যদি ১৯৫২ সালে মুক্তি পেত, তবে এটি হয়তো ভারতীয় আর্ট সিনেমার সূচনা বিন্দু হিসেবে বিবেচিত হতো। এই ছবির মধ্যে আমরা দেশভাগ-পরবর্তী যুবসমাজের হতাশা, চেতনার টানাপোড়েন ও উদ্বাস্তু সংকট দেখতে পাই যা ঘটকের পরবর্তী “মেঘে ঢাকা তারা” ও “সুবর্ণরেখা”য় আরও প্রসারিত হয়। এই ছবিতে ঐতিহ্যবাহী গঠন না মেনে নতুন দৃশ্য-ভাষা ব্যবহার হয়, যা পরবর্তী প্রজন্মের নির্মাতাদের প্রভাবিত করে।
ঘটকের জীবদ্দশায় ছবিটি মুক্তি না পাওয়া এক সাংস্কৃতিক ট্র্যাজেডি। কিন্তু ১৯৭৭-এর পর থেকে “নাগরিক” ঘাটকের প্রতিভার এক নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে ওঠে। এটি যেন এক ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরের ধ্বংসাবশেষ থেকে আবিষ্কৃত মানচিত্র যেখানে প্রত্যাশা, হাহাকার ও স্বপ্ন মিশে থাকে। “নাগরিক” আমাদের দেখায়, চলচ্চিত্র শুধু বিনোদন নয়, এটি একটি সময়ের দলিল, একটি চেতনার প্রতিবিম্ব।
“নাগরিক”-এর যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃত শিল্প হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে স্বীকৃতি পায় না, কিন্তু সময়ের কাঁটায় দাঁড়িয়ে সে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে। ঋত্বিক ঘটক সেই শিল্পীদের একজন, যিনি শহরের নিচু গলির কোণে বসে উচ্চারণ করেছিলেন সমাজ, বিভাজন ও মানবতার কথা।


