উপমহাদেশে ব্রিটিশদের মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা

আমরা যখন ব্রিটিশ ভারতের উপনিবেশিক ইতিহাসের কথা ভাবি, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে লুঠতরাজ, প্রশাসনিক শোষণ, কিংবা শিক্ষাগত সংস্কার।কিন্তু ইতিহাসের এক গোপন স্তর আছে, যেখানে ঘটে গেছে এমন কিছু ঘটনা, যেগুলো না পুরোদস্তুর বিজ্ঞানের আওতায় পড়ে, না শুধুই লোককথা। আজ আলোচনা করবো এমনই এক অধ্যায় হিপনোসিস ট্রায়ালস বা ব্রিটিশদের বাংলায় মননিয়ন্ত্রণ বা সাইকোলজিক্যাল এক্সপেরিমেন্ট চালানোর প্রচেষ্টা নিয়ে।

১৮৪৫ সালে কলকাতায় পোস্ট করা একজন স্কটিশ সার্জন, ড. জেমস এসডেইল (James Esdaile)। তিনি ছিলেন মেসমেরিজম বা হিপনোটিক ট্রান্স ব্যবহার করে ব্যথাবিহীন অস্ত্রোপচারে বিশ্বাসী। এটাই ছিল উপমহাদেশে হিপনোসিসের প্রথম দস্তাবেজভিত্তিক প্রয়োগ। কলকাতার আলিপুর জেলে তিনি শতাধিক কয়েদিকে মেসমেরিক ট্রান্সে পাঠিয়ে অস্ত্রোপচার করেন, কোনও রকম অ্যানেস্থেসিয়া ছাড়াই। ঘটনাটি শুধু ব্রিটিশ চিকিৎসাবিদ্যায় নয়, বরং উপনিবেশিক শাসনের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন অধ্যায় সূচিত করেছিল।

ব্রিটিশরা শুধু হিপনোসিসকে চিকিৎসায় নয়, মনোসংবেদন, নিয়ন্ত্রণ ও শ্রেণিবিন্যাসের একটি উপায় হিসেবেও দেখতে শুরু করেছিল। ১৯ শতকের শেষে ও ২০ শতকের শুরুতে, কলকাতার মেডিক্যাল কলেজ থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্সি জেল পর্যন্ত কিছু অঘোষিত পরীক্ষার দাবি পাওয়া যায় যেখানে বন্দীদের মানসিক অবস্থান বোঝার জন্য মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্নাবলি, আচরণ পর্যবেক্ষণ এবং অজানা স্মৃতিচক্র বিশ্লেষণের কথা বলা হয়েছিল।

ব্রিটিশ প্রশাসনের ভেতরের কিছু রিপোর্টে “problematic native” বা “restless Bengali youth” নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে লেখা হয়, যা অনেক গবেষকের মতে, ব্যবস্থাপনার বাইরে সাইকোলজিক্যাল হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়।

স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে যাঁরা কারাগারে ছিলেন, তাঁদের অনেকের স্মৃতিচারণায়, যেমন ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর আত্মজীবনীতে উল্লেখ আছে অদ্ভুত জিজ্ঞাসাবাদ, ঘুম ভেঙে তাড়িত করা, বারবার একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি, এমনকি স্বপ্নের মাধ্যমে আত্মসমর্পণ ঘটানোর প্রচেষ্টা। যদিও এগুলো সরাসরি হিপনোসিস নয়, কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তারের নিরীক্ষা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। এরকম কিছু কেস ফাইল ১৯৯৮ সালে ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স আর্কাইভ থেকে ডিক্লাসিফায়েড হয়, যেখানে “mental weakening before interrogation” বা “non-coercive psychological trial” শব্দগুলো দেখা যায়।

ড. এসডেইল-এর হিপনোটিক অস্ত্রোপচারের ঘটনাগুলি ইউরোপে আলোড়ন তোলে। কিন্তু অনেক গবেষক বলেন, এসব পরীক্ষা বন্দীদের সম্মতি ছাড়াই করা হতো। এদিকে কিছু সমসাময়িক হিন্দু পুরোহিত ও মুসলিম পীর হিপনোসিসকে অশুভ চর্চা বলেও আখ্যা দেন। David Arnold তাঁর গবেষণায় বলেন, এই ধরনের চিকিৎসা কৌশল এক ধরনের “colonial spectacle” হয়ে উঠেছিল, যা দেখাত ব্রিটিশ বিজ্ঞান কিভাবে বন্য ভারতীয় দেহকে শৃঙ্খলিত করতে পারে। অর্থাৎ হিপনোসিস এখানে শুধু চিকিৎসা ছিল না, মানসিক দাসত্বের একটি প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কিংবা সুকুমার রায়ের লেখায় “মনোবিকার”, “পরামর্শহীন অবচেতনা”, “স্বপ্নদ্রষ্টা” ইত্যাদি চরিত্র বা বিষয়বস্তু উঠে এসেছে, যা সমসাময়িক সমাজে এই মানসিক ও অলৌকিক নিয়ন্ত্রণ তত্ত্বের অস্তিত্বকেই ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে, ইউরোপীয় মনোবিদদের (যেমন সিগমুন্ড ফ্রয়েড, জঁ মার্টিন শারকো) গবেষণাও তখন ভারতীয় উপনিবেশে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। কলকাতার কিছু ব্রিটিশ মনোচিকিৎসক ‘Hypnotic Catalepsy’ ও ‘Suggestion Therapy’ নিয়ে লেখালেখি করেন, যাদের গবেষণা ম্যাড্রাস মেডিকেল কলেজ ও বোম্বে ইউনিভার্সিটির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে, ব্রিটিশরা কি হিপনোসিস বা মননিয়ন্ত্রণকে কেবল চিকিৎসা বা শিক্ষা প্রয়োগে ব্যবহার করেছিল, না কি এর পেছনে ছিল আরও গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য? উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফুকোর বিশ্লেষণে যেতে হবে, যেখানে শাসক শ্রেণি শরীর ও মনের উপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের জন্য জ্ঞান ও চিকিৎসা কে উপায় হিসেবে ব্যবহার করে। অর্থাৎ হিপনোসিস ছিল শুধু অ্যানেস্থেসিয়া নয়, বরং জ্ঞানচর্চা ও ক্ষমতার ছদ্মবেশে মনস্তাত্ত্বিক বন্দিত্ব।

ব্রিটিশ মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ কৌশলের বিরুদ্ধে ভারতীয় বুদ্ধিজীবী সমাজ সরাসরি না বললেও, লেখালেখি, নাটক ও প্রবন্ধের মাধ্যমে এর বিপরীতে ‘আত্মচেতনার পুনর্দাবি’ করা শুরু হয়। ব্রহ্ম সমাজ, আর্য সমাজ এমনকি সুফি চেতনার ধারায়ও হিপনোটিক প্রভাব ও আত্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে চর্চা দেখা যায়।

হিপনোসিস বা মননিয়ন্ত্রণ নিয়ে যেসব ঘটনা বাংলায় ঘটেছিল, তা হয়তো খোলাখুলি নয়। কিন্তু ব্রিটিশদের নিষ্ঠুর শাসননীতি”র এক বিকল্প চেহারা হিসেবে এসব ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা যায়। আমরা যখন স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পড়ি, তখন যুদ্ধ, বিপ্লব আর সাহসের কথা দেখি। কিন্তু এর আড়ালে যে মনস্তাত্ত্বিক স্তর ছিল, চেতনার গভীরে ঢুকে মনকে নিয়ন্ত্রণ করার পরিকল্পনা, তা আজও আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়।

এই বিষয়টির ওপর গবেষণা করতে গেলে যেসব উৎস উঠে আসবে –
James Esdaile’s Hypnotic Surgery in British India – (Wikipedia, Edinburgh Medical Review)
Colonialism and the Body – David Arnold
The Psychology of Rule – Gyan Prakash
Freedom Fighter Memoirs – (e.g. Trilokya Nath Chakraborty, Barindra Kumar Ghosh)
British Archives on Intelligence Files – (Declassified, 1998)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন