উপনিষদ থেকে আধুনিক মনদর্শনের সেতুবন্ধন

চেতনা মানব সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন ও কঠিনতম রহস্য। আধুনিক মনদর্শনে ডেভিড চ্যালমার্স ১৯৯৫ সালে “Hard Problem of Consciousness” শব্দগুচ্ছ প্রচলন করেন, যার মূল প্রশ্ন “কেন আমাদের জীবনীশক্তি, অনুভূতি, রং, সৌন্দর্য, বেদনা—এসব কেবল পদার্থবিদ্যা বা স্নায়ুবিজ্ঞানের ক্রিয়া নয়, বরং অভ্যন্তরীণভাবে অনুভূত হয়?” চেতনার এই ‘কঠিন সমস্যা’ শুধুমাত্র নিউরন, কোষ, কিংবা স্নায়ুতন্ত্র দিয়ে ব্যাখ্যাতীত বলে বিবেচিত হয়।

অন্যদিকে প্রাচীন ভারতীয় দর্শন বিশেষত উপনিষদ, বেদান্ত ও যোগশাস্ত্রে চেতনা, আত্মা ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সম্পর্ককে অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ ও মেটাফিজিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়েছে। আনন্দ বৈদ্যের গবেষণাপত্র এই দুই দুনিয়ার সেতুবন্ধনের চেষ্টা করে কীভাবে উপনিষদীয় ‘প্রকাশ’ ধারণা আধুনিক চেতনা-তত্ত্বকে নতুন আলোকপাত করতে পারে।

চ্যালমার্স তাঁর মৌলিক যুক্তিতে বলেন মানুষের মস্তিষ্ক তথ্য প্রক্রিয়া, আচরণ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি সহজভাবে ব্যাখ্যা করা যায় (Easy Problems)। তবে অভিজ্ঞতার অন্তর্নিহিত গুণাবলি রঙের অনুভূতি (qualia), বেদনার আস্বাদ, প্রেমের স্পর্শ—এসব ‘কেন অনুভূত হয়’—এ প্রশ্ন উত্তরহীন।

উদাহরণস্বরূপ একটি লাল গোলাপের দিকে তাকালে আমাদের মস্তিষ্কে আলো প্রবাহ, রেটিনা-ক্রিয়া, স্নায়ু সংকেত পাঠায়। এগুলো যান্ত্রিকভাবে ব্যাখ্যাতীত নয়। কিন্তু “কেন এইসব প্রক্রিয়ার ফলে লাল রঙ কেমন লাগে” —এ প্রশ্ন একান্তই অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতা, যা পদার্থবিদ্যার ভাষায় ধরা পড়ে না।
চ্যালমার্সের ‘ফিলোসফিক্যাল জম্বি’ চিন্তা-পরীক্ষা এই বিভাজনকে স্পষ্ট করে। এই জম্বি আমাদের মতোই সবকিছু করে, কিন্তু তার ‘অভ্যন্তরীণ কিছু অনুভব নেই’। তাহলে অভিজ্ঞতার উৎস কী? নিউরনের বাইরে কি কিছু রয়েছে?

কঠ উপনিষদে যম ও নচিকেতার সংলাপে ‘আত্মা’ ও ‘ব্রহ্মন’-এর অনুপম ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। যম বলেন— “আত্মা সর্বত্র বিরাজমান, চেতনা যার মূল, সে-ই চূড়ান্ত সত্য। দেহ ক্ষয় হয়, অনুভূতি ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু আত্মা চিরন্তন।”

প্রকাশ উপনিষদ ও বেদান্ত দর্শনে চেতনার মূল প্রতীক। এই ‘প্রকাশ’ একাধারে আলো ও অভ্যন্তরীণ জ্ঞানের রূপ। শঙ্করাচার্য বলেন— “আত্মা নিজ-প্রভা; চেতনা স্বয়ং আলোকিত। এটি বাহ্যিক আলো নয়; বরং এমন এক অন্তর্দৃষ্টির আলো, যা সকল বস্তুকে চেতনায় উদ্ভাসিত করে।”

এই দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী চেতনা স্ব-অস্তিত্বশীল (self-existent)। এটি অনুভবযোগ্য সকল অভিজ্ঞতার ভিত্তি। আনন্দ বৈদ্যের গবেষণাপত্র দেখায়—এই প্রকাশ ধারণা আসলে আধুনিক “foundational consciousness” তত্ত্বের সঙ্গে তুলনীয়। যেমন Integrated Information Theory (IIT) অনুসারে চেতনা কোনো বস্তুগত output নয়; বরং তথ্যসমন্বয়ের মানদণ্ডের ভিত্তিতে সর্বত্র সঞ্চারমান শক্তি।

ভারতীয় দর্শনের প্রকাশ-স্বপ্রভা ধারণা আধুনিক Panpsychism (চেতনা সর্বত্র) ও Galen Strawson-এর ‘Self-Intimating Consciousness’-এর সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। Strawson বলেন—চেতনা এমন এক অভ্যন্তরীণ ব্যাপ্তি, যা সর্বদা নিজেকে অনুভব করে। এটি শুধু তথ্যপ্রক্রিয়া নয়; বরং অভ্যন্তরীণ ভাবে নিজের উপস্থিতির সাক্ষী। উপনিষদীয় সাক্ষি (Sākṣin) ধারণা এখানেই প্রাসঙ্গিক—চেতনা নিজের সত্তারই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।

উপনিষদীয় দর্শনে চেতনার আলোচনা কেবল জ্ঞানতাত্ত্বিক নয়, বরং আত্মার মুক্তির সাথে যুক্ত। মাণ্ডুক্য উপনিষদ বলে জাগ্রত (waking), স্বপ্ন (dreaming), নিদ্রা (deep sleep) অবস্থা ছাড়াও চতুর্থ (Turiya) অবস্থা রয়েছে—যেখানে আত্মা ব্রহ্মনের সঙ্গে একীভূত। এই অবস্থাই চেতনার পরম রূপ।

আধুনিক ভাষায় বললে, এই চতুর্থ অবস্থা চেতনার non-dual awareness-এর সমতুল্য। Sam Harris-এর ‘Waking Up’ গ্রন্থে এই ধারণার আধুনিক প্রতিফলন আছে যেখানে চেতনা থেকে ‘আমি-ভাব’ (ego) বিলীন হয় এবং শুধু বিশুদ্ধ চেতনা থাকে। আনন্দ বৈদ্যের কাজও এই তুলনা তোলে—“Can the Upanishadic Turiya help answer Hard Problem?”

আনন্দ বৈদ্যের গবেষণাপত্র দেখায় উপনিষদীয় দর্শন ও সমকালীন মনদর্শনের মধ্যে অন্তর্গত সংযোগ সম্ভব। প্রথমত উপনিষদ বলে, চেতনা fundamental reality, যা নিউরাল output নয়। দ্বিতীয়ত—প্রকাশ-স্বপ্রভা ধারণা চেতনার intrinsic awareness-এর ব্যাখ্যা দেয়, যা modern analytic philosophy-তেও অনুপস্থিত নয়। তৃতীয়ত—আত্মা-ব্রহ্মন সমতা (Aham Brahmasmi)—চেতনার সর্বব্যাপী স্বরূপের ব্যাখ্যা দেয়, যা Panpsychism ও Cosmopsychism ধারার সঙ্গে তুলনীয়।

এখানে আনন্দ বৈদ্যের অন্তর্দৃষ্টি মূল্যবান—“Indian Metaphysics can help reframe consciousness studies not as mechanistic but as experiential and foundational.” অর্থাৎ চেতনার গবেষণাকে শুধু নিউরোসায়েন্স বা কগনিটিভ সায়েন্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তা অভ্যন্তরীণ চেতনাবিজ্ঞানের আলোয় বিচার করতে হবে।

চেতনার কঠিন সমস্যা আজও মানবজ্ঞান ও বিজ্ঞানের সীমা প্রসারণের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। তবে উপনিষদীয় প্রকাশ-ব্রহ্মপ্রকাশ ধারণা আমাদের স্মরণ করায় চেতনা কেবল একটি শারীরিক প্রক্রিয়া নয়; বরং তা বাস্তবতার সর্বোচ্চ স্তর।

আজকের দিনে আমরা নতুন করে ভাবতে পারি—চেতনা কি আলো? নাকি আলোই চেতনা? হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের উপনিষদীয় দর্শনের গূঢ় গহ্বরেই ফিরতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন