বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও বর্তমানে এর নদ-নদীগুলো ভয়ংকর সংকটের মুখোমুখি। অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ নদ-নদীর বর্তমান মরণদশার পেছনে তিনটি মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, উজানে ভারতের বাঁধ, দ্বিতীয়ত, দেশের শক্তিশালী ব্যক্তি ও কোম্পানির দখল, এবং তৃতীয়ত, সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প। এই সংকট নদী ও পরিবেশের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনজীবনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
ভারতের গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও অন্যান্য প্রধান নদীর উজানে বাঁধ নির্মাণের ফলে বাংলাদেশের নদীগুলোতে পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। চীন যখন ব্রহ্মপুত্রে বাঁধ দিচ্ছে, তখন ভারত প্রতিবাদ করছে, যা প্রকৃতপক্ষে ভাটির দেশের সংকটকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। আনু মুহাম্মদ মনে করেন, এই সংকট সমাধানের একটি সম্ভাব্য উপায় জাতিসংঘের পানি চুক্তিতে স্বাক্ষর করা। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ সরকার ভারতকে খুশি করতে গিয়ে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। অন্তর্বতীকালীন সরকারের উচিত দ্রুত এই বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
নদ-নদী দখলের অন্যতম প্রধান কারণ হলো দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বড় বড় কোম্পানির অনৈতিক কার্যক্রম। আনু মুহাম্মদ বিশেষভাবে বেক্সিমকো, বসুন্ধরা, মেঘনা ও সামিট গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম উল্লেখ করেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে নদী দখল, সম্পদ লুণ্ঠন ও পাচারের সঙ্গে যুক্ত। বিগত সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় তারা তাদের প্রভাব বাড়িয়েছে, কিন্তু বর্তমানে সেই সরকার না থাকলেও তাদের ক্ষমতা অটুট রয়েছে। এই দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে নদী রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে বহু নদী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেমন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবন ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র কুহেলিয়া নদীকে বিলুপ্তির পথে নিয়ে গেছে, এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে যদি বর্জ্য পদ্মা নদীতে ফেলা হয়, তাহলে তা বাংলাদেশের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি বাহিনীও নদ-নদী দখলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
বাংলাদেশের নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। ২০২৩ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের (এনআরসিসি) তালিকা অনুযায়ী দেশে ৯০৭টি নদী ছিল। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা এই তালিকাকে অবৈজ্ঞানিক বলে প্রত্যাখ্যান করেন। পরে মতামত সংগ্রহের মাধ্যমে এই সংখ্যা ১,০০৮-এ উন্নীত করা হলেও সেটাও বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। ২০২৪ সালে পানি মন্ত্রণালয় নতুন একটি খসড়া তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে ১,১৫৬টি নদী অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এই তালিকায় এনআরসিসির তালিকাভুক্ত ২০০টি নদী বাদ পড়েছে এবং নতুন করে ১৪৮টি নদী যুক্ত হয়েছে। নদীসংখ্যা নির্ধারণের এই বিশাল বৈষম্য প্রমাণ করে যে, সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ করা না গেলে নদী ব্যবস্থাপনা কার্যকর করা কঠিন হবে। তাই নদীর সংখ্যা নির্ধারণে বৈজ্ঞানিক ও সমন্বিত পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি।
বর্তমান অন্তর্বতীকালীন সরকার নদী রক্ষায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে। যেমন, নদীর প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে সমন্বিত প্রচেষ্টা, দখল ও দূষণমুক্ত নদী চিহ্নিত করা এবং পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা গ্রহণ করা। তবে এসব উদ্যোগ তখনই কার্যকর হবে, যখন নদীর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক দূর হবে এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ২০২৩ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ৩৭,৩৯৬ জন নদী দখলদারকে চিহ্নিত করেছিল। কিন্তু সেই তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই মুছে ফেলা হয়। এই তালিকা পুনরায় তৈরি করে দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি, যেসব নদী দখল ও দূষণের কারণে মৃতপ্রায়, সেগুলোর পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধারে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
নদী বাংলাদেশের প্রাণ। কৃষি, মৎস্য, পরিবহনসহ নানা খাতে নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু দখল, দূষণ, উন্নয়ন প্রকল্প এবং উজানের বাঁধের কারণে নদীগুলো আজ অস্তিত্ব সংকটে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার, গবেষক, পরিবেশবিদ এবং সাধারণ জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, কার্যকর বাস্তবায়নের দিকেও জোর দিতে হবে। নদী রক্ষা না করলে বাংলাদেশ তার পরিবেশগত ভারসাম্য এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা হারাবে। তাই এখনই সময় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।


