ঈদুল আজহা উৎসবের সামাজিক বৈষম্য : সেলিম জাহান (ভূতপূর্ব পরিচালক , মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ , জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি)

কোরবানির ঈদ নিঃসন্দেহে মুসলিম সমাজের এক মহাউৎসব। উৎসব মানেই আনন্দ, মিলন, উদারতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের প্রকাশ। কিন্তু এই ঈদ উদযাপনের ছায়ায় একটি সুস্পষ্ট অর্থনীতি গড়ে উঠেছে, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে অসমতা ও বৈষম্যের এক নির্মম বাস্তবতা। কেবল আনন্দে মশগুল হয়ে থাকলে সেই অসমতার দিকটি আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়।

কোরবানির ঈদের অন্যতম ব্যয়বহুল দিক হলো পশু ক্রয়। অনেকেই কোরবানির মূল দর্শন ভুলে গিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়েন—কার গরু বড়, কারটা দামি। এই প্রতিযোগিতা শুধু পশুর দামে নয়, প্রদর্শনেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাড়ায় প্রতিবেশীদের মধ্যে শুরু হয় তুলনা; কে কত বড় গরু কোরবানি দিয়েছে, শিশুরাও এই প্রতিযোগিতার চাপে ভোগে। এই ধরনের সামাজিক চাপ শিশুদের মনোজগতে বৈষম্যের বীজ বপন করে খুব অল্প বয়সেই।

পশুর বাজারে চাহিদা পূরণ করতে দেশে-বিদেশে পশু সরবরাহ গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে বৈধ আমদানির পাশাপাশি চোরাচালানও রয়েছে, যার ফলে কোরবানির পশুর বাজারে কালোবাজারি ও অনৈতিক অর্থনীতি গজিয়ে ওঠে। অন্যদিকে, দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বহু কৃষক পরিবার ছোটবেলায় কেনা গরু লালন-পালন করে ঈদের সময় বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এটি একদিকে যেমন অর্থনীতির অংশ, অন্যদিকে আত্মনির্ভরতার একটি গল্পও বটে।

কোরবানির ঈদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক দিক হলো চামড়ার বাজার। প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয় অদক্ষ জবাই, সঠিক সংরক্ষণের অভাব এবং কসাইদের প্রশিক্ষণের অভাবে। অথচ এগুলো রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বিরাট সুযোগ রয়েছে। ভিয়েতনাম যেখানে বাংলাদেশের চেয়ে ১৯ গুণ বেশি চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে, সেখানে আমাদের সীমাবদ্ধতা ভাবনার খোরাক জোগায়।

ঈদের বাজারেও বৈষম্য তীব্র। ধনী শ্রেণির লোকেরা লাখ টাকার লেহেঙ্গা কিংবা তিন প্রস্থ জামা কিনতে পারেন, যেখানে দরিদ্ররা ফুটপাতের পুরনো জামায় সন্তুষ্ট থাকেন। এমনকি কেউ কেউ নিজে কিছু না কিনে সন্তানের জন্য সামান্য জামা কিনেই ঈদ শেষ করেন। এই বৈষম্য দেখা যায় ঈদের খাবারেও—একপ্লেট সেমাই কিংবা একটি রঙিন চুড়িই হয়তো তাদের একমাত্র উৎসব।

সবচেয়ে নির্মম চিত্র দেখা যায় কোরবানির মাংস বিতরণের সময়। ধনীরা ঘরের ভেতর পোলাও মাংস খাচ্ছেন, আর বাইরে দরিদ্ররা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে, কখনো মারামারি পর্যন্ত হচ্ছে। কিছু মানুষ গোশতের অপেক্ষায় আহত হন, কেউ হয়তো পান না কিছুই। এমনকি অনেকে ঈদের পরদিন আবর্জনার স্তূপে খুঁজে ফেরেন ফেলে দেওয়া খাবারের অবশিষ্টাংশ।

সবকিছু মিলিয়ে কোরবানির ঈদের অর্থনীতির ছায়ায় সমাজে অসমতা আরও বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। যদিও পুরো বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়, তবু অন্তত এর নগ্ন প্রকাশ রোধে আমাদের সংবেদনশীল হওয়া জরুরি। ঈদের মূল আত্মা যদি সত্যিই ভ্রাতৃত্ব ও সহানুভূতি হয়, তাহলে উৎসব যেন কাউকে ছোট না করে, কাউকে অসম্মান না করে। আমরা শুরুটা করতে পারি নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন থেকে। সমাজের প্রতিটি স্তরে সমতা ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টাই হতে পারে ঈদের প্রকৃত শিক্ষা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন