বর্তমানে জামায়াত এবং তার ছাত্রসংগঠনের ভূমিকা প্রশংসনীয়। যারা খোঁজখবর রাখেন, তাদের সবার কাছে এটা অত্যন্ত পরিষ্কার, পর্দার আড়ালে থেকে কীভাবে তারা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে সহযোগিতা করেছে। এর ফলে আমরা দেখেছি, (৫ আগস্ট) সেনাপ্রধানের নেতৃত্বে প্রথম যে বৈঠক হয়, সেখানে জামায়াতের আমিরকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এখনো জাতীয় ইস্যুগুলোতে জামায়াতের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করা হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় জামায়াতের মতো সুশৃঙ্খল দল আর নেই।
মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পর্ক না থাকলেও আদর্শিক বন্ধন আছে। দুটি সংগঠনের মধ্যে যথেষ্ট বোঝাপড়া হয়েছে। তারা একে অন্যকে সহোদর হিসেবে মনে করে। এ রকম আরও কিছু আন্দোলন গড়ে উঠেছে তুরস্কে আক পার্টি (জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি), তিউনিসিয়ায় এন্নাহদা এবং মরক্কোতে জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি। এগুলোর সঙ্গেও জামায়াতের একটা সুসম্পর্ক আছে।
আমি চাচ্ছিলাম, একটা সেন্টার রাইট পলিটিক্যাল পার্টি উইথ ইসলামিক রেফারেন্স (ইসলামি যোগসূত্রসহ মধ্য ডানপন্থী দল)। এটা বাংলাদেশে কার্যকর হবে। জামায়াতে ইসলামী তো ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে। কিন্তু নতুন এই রাজনৈতিক দল ইসলাম থেকে অনুপ্রেরণা নেবে, কিন্তু ইসলামি রাষ্ট্র কায়েমের কথা বলবে না এ ধরনের একটি সেন্টার রাইট পলিটিক্যাল পার্টি বাংলাদেশে প্রয়োজন। এ ধরনের দল খুবই প্রয়োজন, যেটা ইনক্লুসিভ (অন্তর্ভুক্তিমূলক) হবে, সবাইকে নিয়ে চলবে। আপাতত তেমন কোনো দল দেখছি না। তবে ভবিষ্যতে এ রকম কোনো দলের উত্থান হলেও হতে পারে।
একটা সময় আমাদের এখানকার রাজনীতির মান অনেক উন্নত ছিল। কিন্তু সেখান থেকে আমাদের অনেক অবনমন হয়েছে। প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে নির্মূল করার রাজনীতি চালু করা হয়েছিল। আমাদের এখান থেকে বের হয়ে পূর্বের ঐতিহ্যে ফিরতে হবে। ছাত্ররা যদি কোনো উদ্যোগ নেয়, সেটা নিশ্চিতভাবেই আমাদের জন্য ভালো কিছু হবে। কিন্তু রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন ছাড়া আমরা অগ্রসর হতে পারব না। ৫ আগস্টের (গণঅভ্যুত্থানের) পরও আমরা যদি পুরোনো রাজনীতিতে ফিরে যাই, সেটা হবে সবচেয়ে দুঃখজনক। পুরোনো রাজনীতির মধ্যে দেশ ও জাতির কোনো কল্যাণ নেই।
আইডিয়ালি (আদর্শিকভাবে) বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এমন হতে পারত, যে রকম সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক তেমনটা নয়। এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় হলো, আমাদের যা কিছু পাওনা ভারতের কাছে, বাংলাদেশ তা আদায় করতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারকে একতরফা সমর্থন দিয়ে ভারত আমাদের গণতন্ত্র ধ্বংসে ভূমিকা রেখেছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ছোটখাটো দায় থাকতে পারে, কিন্তু বহুলাংশে ভারতই দায়ী। আমরা চাই না এখানে ভারতবিরোধী মনোভাব তীব্র হোক আর সেটা কাজে লাগিয়ে কেউ ক্ষমতায় চলে যাক। কিন্তু এ ব্যাপারে ভারতকেই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে।
বাংলাদেশ একটি মডারেট মুসলিম দেশ। এখানে কোনো দিন উগ্রবাদ মাথাচাড়া দেবে না। হতে পারে, কিছু লোক ওই ধরনের আদর্শে বিশ্বাসী হবে; বাংলা ভাই এ রকম একজন ছিল, আরও দু-চারজন ছিল। কিন্তু একটা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ কোনো সময়ই উগ্রবাদকে স্থান দেবে না, এটা ভারতের বোঝা উচিত।
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং পরে এবি পার্টির প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। উভয় দল থেকেই পদত্যাগ করেন। প্রথম আলোর সাথে সাক্ষাৎকার থেকে সংকলিত।


