বিশ্বজুড়ে শিল্প কারখানা ও নির্মাণ খাতে ইস্পাত অন্যতম প্রধান উপাদান। তবে এই অপরিহার্য ধাতুটি তৈরির পেছনে রয়েছে পরিবেশের জন্য এক অদৃশ্য সংকট। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA)-এর তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) নিঃসরণের প্রায় ৮% থেকে ৯% কেবলমাত্র ইস্পাত উৎপাদন খাত থেকে আসে। আশ্চর্যের বিষয় এই খাতের কার্বন ফ্লুটপ্রিন্ট ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট বার্ষিক নিঃসরণের থেকেও বেশি।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো রাজ্যের বোল্ডার-ভিত্তিক স্টার্টআপ Electra (ইলেকট্রা) এমন একটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে, যা ইস্পাত উৎপাদন খাতে শূন্য-কার্বন বিপ্লবের সম্ভাবনা জাগিয়েছে।
বর্তমানে ইস্পাত উৎপাদনের জন্য দুইটি পদ্ধতি বেশি প্রচলিত, ব্লাস্ট ফার্নেস (Blast Furnace) — যেখানে কয়লা (কোক) দিয়ে উচ্চতাপমাত্রায় লোহা আকরিক গলানো হয় (প্রায় ১৫০০°C)। ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস (Electric Arc Furnace) — যেখানে পুনর্ব্যবহৃত লোহা বা স্ক্র্যাপ গলানো হয়, যদিও এখানে কয়লার ওপর নির্ভরতা কিছুটা কম। উভয় পদ্ধতিতেই বড় মাত্রায় কার্বন নিঃসরণ ঘটে, কারণ তাপশক্তি উৎপাদন ও রাসায়নিক বিক্রিয়ায় CO₂ নির্গত হয়।
ইলেকট্রার প্রযুক্তি মূলত ইলেকট্রোকেমিক্যাল রিডাকশন (Electrochemical Reduction) পদ্ধতিনির্ভর। এখানে নিম্ন-গ্রেড লোহা আকরিক (Fe₂O₃) একটি বিশেষ ইলেকট্রোলাইট সলিউশনে রাখা হয় এবং মাত্র ১৪০°F (প্রায় ৬০°C) এ বৈদ্যুতিক প্রবাহের মাধ্যমে বিশুদ্ধ লোহা উৎপাদিত হয়।
প্রক্রিয়াটি তিনটি মূল দিক থেকে বৈপ্লবিক: উচ্চতাপের প্রয়োজন নেই, ফলে কয়লার দরকার হয় না। নিম্ন-গ্রেড আকরিকও ব্যবহৃত হয়, যা খরচ কমায়। সম্পূর্ণভাবে বিদ্যুৎচালিত যদি পুনর্নবীকরণযোগ্য বিদ্যুৎ (সৌর বা বায়ু) ব্যবহার হয়, নিঃসরণ প্রায় শূন্য।
ইলেকট্রার সহ-প্রতিষ্ঠাতা সানদীপ নিজহাওয়ান বলেন, “আমরা ইস্পাত উৎপাদনের ধারাটাই পাল্টে দিচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে গ্রিন ইলেকট্রিসিটি ব্যবহার করে কার্বন-নেগেটিভ ইস্পাত উৎপাদন।”
ইলেকট্রা সম্প্রতি কলোরাডোতে তাদের ডেমো প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য ৮ মিলিয়ন ডলার ট্যাক্স ক্রেডিট পেয়েছে। নিউকোর (যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম ইস্পাত নির্মাতা), খনি জায়ান্ট বিএইচপি এবং অ্যামাজন ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে। কলোরাডো এনার্জি অফিসের নির্বাহী পরিচালক উইল টুর বলেন, “এই প্রযুক্তি আমাদের শিল্প খাতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।”
কেন কার্বন নিঃসরণ কমানো জরুরি?
ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (IEA)-এর মতে, প্যারিস চুক্তির ২০৫০ সালের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে ইস্পাত শিল্পের বার্ষিক নিঃসরণ ৭৫% কমাতে হবে। ইলেকট্রার মতো প্রযুক্তি এ লক্ষ্যে কার্যকর হাতিয়ার। বাংলাদেশের ইস্পাত খাত দ্রুত বিকাশমান। দেশে বছরে প্রায় ৮-৯ মিলিয়ন মেট্রিক টন ইস্পাত উৎপাদিত হয়, যার ৪০% আসে পুনর্ব্যবহৃত স্ক্র্যাপ থেকে এবং ৬০% আমদানিকৃত লোহা আকরিক থেকে।
চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও সীতাকুণ্ডে অবস্থিত বড় ইস্পাত কারখানাগুলো এখনো উচ্চতাপমাত্রার ব্লাস্ট ফার্নেস পদ্ধতি ও গ্যাসচালিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে। যদি ইলেকট্রার প্রযুক্তি বাংলাদেশে আমদানি হয় এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, তাহলে দেশের শিল্প খাতে কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এ ছাড়া, নিম্ন-গ্রেড আকরিক ব্যবহারের সুবিধা থাকায় খরচও কমবে, যা স্থানীয় উৎপাদনকে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
ইলেকট্রার উদ্ভাবনী প্রযুক্তি বৈশ্বিক ইস্পাত শিল্পে এক বিপ্লবের সূচনা করেছে। এটি পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত—তিন দিক থেকেই সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর সামনে সুযোগ রয়েছে এই প্রযুক্তিকে দ্রুত গ্রহণ করে টেকসই শিল্পায়নের পথে এগিয়ে যাওয়ার। শুধু কার্বন নিঃসরণ কমানো নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে এমন প্রযুক্তিই হতে পারে সময়ের শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ।


