প্রায় চার দশক ধরে শক্ত হাতে ইরান শাসন করছেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। এ সময়কালে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা পরাশক্তিদের বাঁধা সত্ত্বেও ইরানের সামরিক শক্তিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ আন্দোলন ও ভিন্নমত দমন করেছেন।
ইরানের সরকার, বিচার বিভাগ ও সেনাবাহিনীর ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখেছেন খামেনি। পাশাপাশি তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বিপ্লবী গার্ড ও কুদস বাহিনী—যারা হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুতিদের পৃষ্ঠপোষকতা করে।
ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে ১৯৩৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন খামেনি। তিনি ইরানের ইসলামি বিপ্লবের প্রধান নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির ঘনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন। সেই বিপ্লবেই পশ্চিমাপন্থি রাজতন্ত্র উৎখাত হয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৮১ সালে খোমেনির বিরোধীরা খামেনিকে হত্যা চেষ্টা করলে তার ডান হাত অকেজো হয়ে যায়। খোমেনির মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হন খামেনি।
প্রথম দিকে প্রেসিডেন্ট হাশেমি রফসানজানির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন খামেনি। তবে পরবর্তী সময়ে দুই জনের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ১৯৯৭ সালে সংস্কারপন্থি মোহাম্মদ খাতামির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর রাজনৈতিক সংস্কার ও পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রস্তাব খামেনির কট্টর রক্ষণশীল অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।
২০১৩ সালে হাসান রুহানি প্রেসিডেন্ট হলে খামেনি কিছুটা নমনীয় অবস্থান নেন এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির আলোচনায় অনুমতি দেন। ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত হয় বহুল আলোচিত যৌথ কর্মপরিকল্পনা বা ছয় পরাশক্তির সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি। যদিও ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিলে খামেনি এটিকে ‘আমেরিকার প্রতারণার প্রমাণ’ হিসেবে তুলে ধরেন।
২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর গড়ে ওঠা গ্রিন মুভমেন্ট ছিল তার শাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বিজয়ের বিরোধিতা করে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। তখন খামেনির বিরুদ্ধে সরাসরি স্লোগানও শোনা যায়।
২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর হিজাব ইস্যুতে ইরানে আবারও বিশাল আন্দোলন হয়। এই বিক্ষোভে বহু মানুষ নিহত হন এবং খামেনির পদত্যাগ দাবি করে স্লোগান দেওয়া হয়। তবে এই বিক্ষোভকেও তিনি ‘বাইরের ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যা দেন।
খামেনির দৃষ্টিতে ইসরায়েল একটি ‘অবৈধ রাষ্ট্র’। তিনি রমজানের শেষ শুক্রবারকে ‘কুদস দিবস’ হিসেবে ঘোষণা দেন এবং ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোকে সরাসরি সমর্থন দেন।
সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর তিনি ইরানকে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন এবং ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ নামে পরিচিত একাধিক মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠী গড়ে তোলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের অবস্থান শক্ত করেন।
তিন দশকেরও বেশি সময় ইরানকে নেতৃত্ব দিলেও খামেনি তার শত্রুদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়াননি। তবে ইরানের এই মনোভাবে পরিবর্তন আসে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, যখন হামাস ইসরায়েলে হামলা চালায়।
ইসরাইল যখন গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে, তখন মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র ইরানই তার মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দিয়ে ইসরাইলের বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বাকিরা কেবল মুখে প্রতিবাদ জানিয়ে বা আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব সারে।
এরপর গাজায় ইসরায়েলি যুদ্ধ, হিজবুল্লাহর ওপর হামলা এবং গত সপ্তাহে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের ওপর ইসরায়েলের নজিরবিহীন হামলায় পরিস্থিতি বদলে যায়। শুরু হয় ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ।
ট্রাম্প ইরানকে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’র আহ্বান জানালে প্রত্যুত্তরে খামেনি বলেছেন, ‘যারা ইরান, এর জনগণ ও ইতিহাস সম্পর্কে জানেন তারা এমন ভাষায় হুমকি দেন না। কারণ, ইরানিরা আত্মসমর্পণ করার জাতি নয়।’
৮৫ বছর বয়সী খামেনি শারীরিক অবস্থা ও বয়স বিবেচনায় তার উত্তরসূরি নিয়ে আলোচনা তীব্রতর হয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন তার ছেলে মোজতবা খামেনি উত্তরসূরি হতে পারেন। আবার কেউ কেউ সদ্য প্রয়াত প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির দিকেও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে।


