ইরানের ইতিহাস নানা রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিবর্তনের সাক্ষী। প্রাচীন পারস্য সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে আধুনিক ইরান, এই ভূখণ্ডে বহুবার শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। ১৯২৫ সালে রেজা শাহ পাহলভি আধুনিকীকরণের নামে ধর্মনিরপেক্ষতার পথ ধরেন, কিন্তু সেই সংস্কার ছিল অনেকাংশে ‘উপরে-থেকে-নিচে’ চাপিয়ে দেওয়া, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ১৯৫৩ সালে সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে অপসারণ এবং শাহের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ইরানিদের মধ্যে পশ্চিমা হস্তক্ষেপ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়। এই ক্ষোভ, আধুনিকীকরণের গতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সংকট ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের দিকে নিয়ে যায়, যেখানে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইরান একটি ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়।
ইরানে ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে প্রচলিত আপত্তি হলো এটি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের হাতিয়ার, যা ইরানিদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে ফেলে পশ্চিমা মূল্যবোধ চাপিয়ে দিতে চায়। এই ধারণার শিকড় রয়েছে পাহলভি আমলের দ্রুত আধুনিকীকরণ ও পশ্চিমা হস্তক্ষেপে। জালাল আল-এ-আহমাদ তাঁর বিখ্যাত ‘ঘারবজাদেগি’ (Westoxification) তত্ত্বে বলেন, পশ্চিমা ভাবধারা ও উপাদানের ওপর অতিনির্ভরতা ইরানের আসল পরিচয়কে ক্ষয় করে দেয়। দারিউশ শায়েগানও তাঁর লেখায় পূর্ব ও পশ্চিমের দ্বৈততার কথা বলেন। ইসলামী বিপ্লবের অনেক নেতাই এই দর্শনে প্রভাবিত ছিলেন, এমনকি নির্বাসিত অবস্থায় খোমেনি পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে মুসলিম সমাজের জন্য হুমকি বলে চিহ্নিত করেন।
ইসলামী প্রজাতন্ত্রের আদর্শিক ভিত্তি হলো ‘পূর্ব বনাম পশ্চিম’ দ্বৈততা। কিন্তু বাস্তবে ‘পশ্চিম’ বা ‘পূর্ব’ কী তা স্পষ্ট নয়। এটি কখনো নৈতিকতা, কখনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, কখনো রাজনৈতিক স্বার্থ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এই দ্বৈততা বাস্তবতাকে অতিসরলীকরণ করে এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বৈচিত্র্যকে আড়াল করে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পরপরই হাজার হাজার নারী বাধ্যতামূলক হিজাবের বিরুদ্ধে ছয় দিন ধরে প্রতিবাদ করেছিলেন, যা দেখায় সমাজে মতবিরোধ ও বহুত্ববাদ ছিল এবং আছে।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে যে সংবিধান গৃহীত হয়, তা দ্বাদশ ইমামিয়া শিয়া মতবাদের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।সংবিধানের ২, ৪ ও ১২ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের সকল আইন ও নীতিমালা ইসলামী মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে হবে এবং দ্বাদশ ইমামিয়া শিয়া মতবাদই হবে রাষ্ট্রধর্ম। এই কাঠামো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রচিন্তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
ইরানে বাধ্যতামূলক হিজাব আইন নারীর স্বাধীনতা ও সমানাধিকারের প্রশ্নে একটি কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ২০২২ সালে ‘জান, জিন্দেগি, আজাদি’ (নারী, জীবন, স্বাধীনতা) স্লোগানে নারীরা রাস্তায় নেমে আসে। শুধু অবহেলিত নারীরাই নয় বরং হিজাব পরা অনেক নারীও সমানভাবে প্রতিবাদে অংশ নেন। এই আন্দোলন ইরানিদের দীর্ঘস্থায়ী ও বহুমাত্রিক অসন্তোষের প্রতিফলন, যার মূল কারণ হচ্ছে ধর্মীয় আদর্শভিত্তিক শাসনব্যবস্থার প্রতি ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ এবং নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের ধারাবাহিকতা।
ধর্মনিরপেক্ষতা মানে রাষ্ট্রের আইন ও নীতিনির্ধারণে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কোনো ধর্মবিশ্বাসকে বিশেষ সুবিধা না দেওয়া এবং সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা। জন লক তাঁর ‘লেটার অন টলারেশন’-এ বলেছিলেন, “ধর্ম ও রাষ্ট্রের কাজের সীমানা নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি, নইলে চিরকাল দ্বন্দ্ব চলতেই থাকবে।” কারণ কোনো জাতি কখনোই একক ধর্মীয় আইন বা তার ব্যাখ্যার ওপর সর্বসম্মত হতে পারে না; তাই নাগরিক অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রকে নিরপেক্ষ থাকতে হয়।
‘ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের হাতিয়ার’—এই যুক্তি প্রধানত তিনটি দাবির ওপর দাঁড়িয়ে, (১) সাম্রাজ্যবাদ intrinsically ভুল; (২) ধর্মনিরপেক্ষ ইরান ধারণা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের সৃষ্টি ও তার স্বার্থরক্ষাকারী; (৩) তাই ধর্মনিরপেক্ষ ইরান প্রত্যাখ্যাত হওয়া উচিত। প্রথম দাবিটি মেনে নিলেও দ্বিতীয়টি দুর্বল, কারণ ধর্মনিরপেক্ষতার ইতিহাস শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ নয় ভারত, চীন, এমনকি ইসলামী ঐতিহ্যেও ধর্মনিরপেক্ষতার ছাপ আছে। তাছাড়া ইরানের অভ্যন্তরেও অসংখ্য মানুষ ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণের পক্ষে।
এই যুক্তি ইরানিদের নিজস্ব বিবেচনা ও আত্মনির্ধারণের সক্ষমতাকে খাটো করে দেখে, যা নিজেই এক ধরনের ঔপনিবেশিক মনোভাব। প্রকৃতপক্ষে ধর্মনিরপেক্ষতা কোনো ধর্মবিরোধী মতবাদ নয়, বরং এটি ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার পূর্বশর্ত।
ইরানে ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে ‘ঔপনিবেশিক’ যুক্তি যেমন দুর্বল, তেমনি এটি প্রকৃতপক্ষে ইরানি জনগণের বহুমাত্রিকতা, মতবৈচিত্র্য ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করে। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মের প্রতি বৈরিতা নয় বরং সকল মত ও বিশ্বাসের প্রতি সমান শ্রদ্ধা ও সুযোগ নিশ্চিত করা।ইরানের বর্তমান আন্দোলন, বিশেষত ‘জান, জিন্দেগি, আজাদি’ স্লোগান, ইঙ্গিত দেয় সমাজে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি সমর্থন বাড়ছে এবং এটি এখন আর কেবল পশ্চিমা ধারণা নয়, বরং ইরানিদের নিজেদের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।


