‘ইভিল আই’ ও বাংলার ‘নজর লাগার’ অদৃশ্য সংস্কৃতি

বাংলা সংস্কৃতিতে ‘নজর লাগা’ একটি বহুল প্রচলিত কিন্তু রহস্যময় ধারণা। শিশুর কপালে কালো টিপ, চোখে নীল সুতো, অথবা প্রশংসার পর ‘থুতু’ ফেলার ভান—এইসব আচার যেন এক অদৃশ্য শক্তির প্রতিরোধক। বলা হয় কারও সৌন্দর্য, সাফল্য বা সুখ দেখে কেউ ঈর্ষান্বিত দৃষ্টিতে তাকালে তা দুর্ভাগ্য বা অসুস্থতা ডেকে আনতে পারে। একে শুধু কুসংস্কার বললে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে হাজার বছরের আন্তঃসাংস্কৃতিক ইতিহাস, মনস্তত্ত্ব এবং এক ধরণের গভীর মানবিক শঙ্কা, যাকে বলা হয়—‘ইভিল আই’।

‘ইভিল আই’ বা “অশুভ দৃষ্টি”-এর ধারণা শুধু বাংলার নয়। এটি গ্রীক, রোমান, তুর্কি, মিশরীয়, পারস্য, ইসলামি, ইহুদি এবং হিন্দু সমাজে বিভিন্ন নামে প্রচলিত ছিল। প্রাচীন গ্রিসে একে বলা হতো baskanos, যার মূল মানে ঈর্ষাজনিত চোখের অভিশাপ। প্লিনি দ্য এল্ডার নামক রোমান ইতিহাসবিদ বিশ্বাস করতেন, কিছু মানুষের চোখে ছিল এমন শক্তি যা শিশুদের হত্যা করতে পারত, এমনকি ফলমূলও শুকিয়ে দিত।

তুর্কি সংস্কৃতিতে ‘নাজার বনচুক’ নামে একটি বিখ্যাত নীল রঙের চোখের আকৃতির তাবিজ দেখা যায়, যা আজও নানাভাবে ব্যবহৃত হয়। ইসলামি সমাজে আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস ইত্যাদি নজর কাটানোর কোরআনিক পদ্ধতি হিসেবে গৃহীত। হিন্দু সমাজে ‘ড্রষ্টি দোষ’ নামেও এই ধারণা প্রচলিত।এইসব সংস্কৃতি একমত, চোখ কেবল দৃষ্টির অঙ্গ নয়, বরং মন, ইচ্ছা, ঈর্ষা ও শক্তির বাহক।

বাংলা সমাজে ‘নজর’ বিষয়টি খুব ঘরোয়া, অথচ গম্ভীর। শিশুর কপালে কালি দেওয়া হয়, “অসুন্দর” দেখালে শয়তানের চোখ পড়বে না ভেবে! বাচ্চা বেশি হাসলে বা সুন্দর দেখালে বলা হয়, “চোখ লেগে যাবে”। মা-বোনেরা মুখে থুতু ফেলার ভান করেন, কারও প্রশংসার পর বলেন—“যেন চোখে না লাগে”। গ্রামীণ বাংলায়, কারও হঠাৎ জ্বর হলে, গরু দুধ কম দিলে, এমনকি গাছের ফল না ধরলেও ধরা হয়—“নজর লেগেছে”। এই লোকবিশ্বাসে নজর হচ্ছে এক ধরণের মনোশক্তি, যা চোখের মাধ্যমে আঘাত করে। এটি দৃশ্য নয়, দৃষ্টির প্রক্ষেপিত আকাঙ্ক্ষা।

বাংলার নানা অঞ্চলে নজর কাটাতে প্রচলিত রয়েছে কিছু আচার ও তন্ত্র:

লাল মরিচ পোড়ানো: শিশুর নজর কাটাতে শুকনো মরিচ আগুনে পোড়ানো হয়। বিশ্বাস করা হয়, গন্ধে নজরের আগুন নিভে যায়।
সরিষা ও লবণ দিয়ে ঘুরানো: কারও চারপাশে এগুলো তিনবার ঘুরিয়ে আগুনে ফেলা হয়।
কলা পাতায় চোখ আঁকা: বিশেষ দিনে ঘরের দরজায় ঝুলিয়ে রাখা হয়।
নীল রঙের সুতো বা পাথর: চোখের রঙ নীল হলে তা ‘নজর’ প্রতীকী হয়—এই বিশ্বাস থেকেই নীল বস্তুর মাধ্যমে নজর প্রতিরোধ করা হয়। এইসব চর্চা শুধু লোকজ নয়, বরং তন্ত্রবিদ্যায়ও চোখকে ‘অগ্নি কেন্দ্র’ হিসেবে ধরা হয়, যেখানে দৃষ্টি হচ্ছে ‘তেজস’ শক্তির বাহক।

চোখ ও মন: বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে নজর
মনোবিজ্ঞানে একটি ধারণা রয়েছে, Self-fulfilling prophecy—যা আমরা বিশ্বাস করি, তা নিজের অজান্তেই বাস্তব হয়ে ওঠে। নজরের ভয় যদি কারও মধ্যে গেঁথে যায়, তাহলে তার শরীর বা মন এমন প্রতিক্রিয়া দিতে পারে যা বাস্তব রোগের মতো প্রকাশ পায়। ফলে ‘নজর লাগা’ কেবল বাহ্যিক নয়, মানসিক প্রতিক্রিয়ারও বহিঃপ্রকাশ।

আধুনিক নিউরোসায়েন্স বলে চোখের দৃষ্টি যখন কারও দিকে গভীরভাবে নিবদ্ধ হয়, তখন মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা এবং mirror neurons সক্রিয় হয়।কেউ যদি ঈর্ষান্বিত, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বা ভয়ানক দৃষ্টিতে তাকায়, তা আপনি ‘শরীর দিয়ে’ অনুভব করতে পারেন। এই বিজ্ঞান চোখ দিয়ে অভিশাপ ছোঁড়ার কথা প্রমাণ করে না, কিন্তু মানুষের দৃষ্টিশক্তির মানসিক ও আবেগীয় শক্তির গুরুত্বকে অস্বীকারও করে না।

আধুনিক যুগে নজরের ধারণা আরও সূক্ষ্ম হয়ে উঠেছে। ইনস্টাগ্রামে সন্তান বা সাফল্যের ছবি পোস্ট করার পর মানুষ (ইভিল আই ইমোজি) ব্যবহার করে। কেউ কেউ প্রোফাইলে “No Evil Eye” লিখে রাখে। এ যেন এক আধুনিক তাবিজ, ডিজিটাল ঝাড়ফুঁক। এমনকি কিছু মানুষ অজানা অস্থিরতায় ভোগে যখন তারা প্রচারের পর হঠাৎ দুর্ভাগ্য দেখে। এ যেন পুরনো বিশ্বাসের নতুন অবয়ব—“চোখ লেগে গেছে”।

নজরের ধারণা অনেকসময় নারী-শরীর ও মাতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। নারী যখন সন্তান জন্ম দেয়, তার চারপাশে বেড়ে যায় নজরের ভয়। আবার নারী যখন সৌন্দর্যের প্রতীক হয়, তাকেই ঘিরে ‘চোখের অভিশাপ’ ডেকে আনা হয়। এক অর্থে নজর ধারণা নারীত্বকে simultaneously শক্তি ও দুর্বলতার উৎসে পরিণত করে। এই দ্বান্দ্বিকতা সমাজে নারী-পুরুষ ভেদে নজরের ব্যাখ্যা কে আরও গভীর করে তোলে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন