ইরাকের প্রধান নদী ইউফ্রেটিস ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমন নিম্ন পানিস্তরে পৌঁছেছে, যা দেশটির ৪৬ মিলিয়ন মানুষকে তীব্র পানি সংকটের মুখোমুখি করেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা একাধিক কারণকে এই সংকটের জন্য দায়ী করছেন, যার মধ্যে প্রধান হলো জলবায়ু পরিবর্তন, দীর্ঘমেয়াদি খরা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে নদীর উপর নির্মিত বাঁধ।
ইরাকের পানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নদীর বর্তমান পানি স্তর গত ৮০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলো, যেমন বসরা, কারবালা এবং মহদিয়া পানির তীব্র অভাবের সম্মুখীন। নদীর পানিতে জলজ উদ্ভিদ ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ বৃদ্ধি পেয়ে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি অবস্থা এমনই থাকে আগামী কয়েক মাসে পানি সংকট আরও তীব্র আকার নিতে পারে।
ইরাকের প্রতিবেশী দেশ তুরস্ক ও সিরিয়া ইউফ্রেটিস নদীর উপর বড় ধরনের বাঁধ নির্মাণ করেছে। তুরস্কের ইলিসু বাঁধ এবং সিরিয়ার বিভিন্ন প্রজেক্ট নদীর মূল প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছে যার ফলে ইরাকের পানি সরবরাহ কমে গেছে। ইরাক সরকার ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পানি ভাগাভাগি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে, যাতে দেশের জন্য নির্ধারিত পানি নিশ্চিত করা যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনও সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরাকের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে গেছে। নদীর উজানের অঞ্চলগুলোতে তুষারপাতের পরিমাণ কম হওয়ায় নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ইরাকে ভবিষ্যতে আরও তীব্র পানি সংকট তৈরি হতে পারে।
নদীর পানি হ্রাসের ফলে মেসোপটেমিয়ান প্রাচীন বন্যাঞ্চলগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। এটি শুধু বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা প্রভাবিত করছে না, বরং অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কৃষি এবং মৎস্যচাষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ফলে খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনীতিও ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইরাকি পানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা অল্প পরিমাণে সংরক্ষিত পানি ছেড়ে দিয়ে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি টেকসই সমাধান নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বাঁধের কার্যক্রম পুনর্বিবেচনা এবং জলবায়ু অভিযোজনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিনের জীবনে পানি সংগ্রহ ও ব্যবহার এখন কঠিন হয়ে উঠেছে। বহু পরিবার দূরের নদী বা সংরক্ষিত জলে নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে। স্কুল এবং হাসপাতালগুলিতেও পানি সরবরাহ সীমিত। পানি সংকটের ফলে জীবিকার ওপর প্রভাব পড়ছে, যার মধ্যে কৃষি শ্রমিক ও মৎস্যচাষীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।


