ইতিহাসের দুর্ধর্ষ এক স্নাইপার সোভিয়েত ইউনিয়ন রেড আর্মির লুডমিলা পাভলিচেঙ্কো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সাহসিকতার জন্য তিনি ‘লেডি ডেথ’ নামেও পরিচিত।
১৯১৬ সালে ইউক্রেনে জন্ম নেয়া লুডমিলা পাভলিচেঙ্কো ১৪ বছর বয়সে সপরিবার কিয়েভে বসবাস শুরু করেন। সে সময়ই শুটিংয়ের হাতেখড়ি। শুটিংয়ে দক্ষতার জন্য ভেরোশিলভ শার্পশুটার ব্যাজ এবং মার্কসম্যান সনদ পেয়েছিলেন। পরে স্থানীয় অস্ত্র কারখানায় কাজ শুরু করেন। ১৯৩৭ সালে কিয়েভ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
১৯৪১ সালের ২২ জুন হিটলারের নাৎসি জার্মানির সশস্ত্র বাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়নে আক্রমণ শুরু করে। লুডমিলা পাভলিচেঙ্কোর কানে আসে এ খবর।দ্রুত রেড আর্মির রিক্রুটমেন্ট অফিসে গিয়ে উপস্থিত হন। রিক্রুটমেন্ট অফিসাররা প্রথমে তাঁকে নার্স হিসেবে নিয়োগ দেন।
একজন স্নাইপার হওয়ার জন্য তিনি দৃঢ়চিত্ত ছিলেন। সোভিয়েত বাহিনীর হাতে রক্ষার দায়িত্ব থাকা পাহাড়ে রোমানিয়ার সৈনিকদের সঙ্গে বীরত্বপূর্ণ লড়াই করে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করলে রেড আর্মির ২৫তম রাইফেল ডিভিশনে স্নাইপার হিসেবে নিয়োগ পান। সেখানে তিনি রেড আর্মির ২০০০ মহিলা স্নাইপারদের একজন হয়ে ওঠেন, যাদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন যুদ্ধে বেঁচে যান।
লুডমিলা পাভলিচেঙ্কো প্রথমে ওদেসা পোর্ট অবরোধে সামনের সারিতে লড়াই করেন। সেখানেই দক্ষতা দেখান। ১৮৭ জন শত্রু ওদেসায় তাঁর হাতে বধ হন। সিনিয়র সার্জেন্ট পদে পদোন্নতি পান তিনি।
১৯৪১ সালের অক্টোবরে নাৎসি বাহিনী ও রোমানীয় সেনাবাহিনী ওদেসার নিয়ন্ত্রণ নিলে পাভলিচেঙ্কো ও তাঁর ইউনিট সমুদ্রপথে সেভাস্তোপোলের দিকে অগ্রসর হয়।
এরপর শুরু হয় ঐতিহাসিক সেভাস্তোপোলের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে পাভলিচেঙ্কো বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেন। তাঁর বীরত্বের কথা নাৎসিরাও জানত, পাভলিচেঙ্কোর নাম শুনলে ভয় পেত তারা।
১৯৪২ সালের মে মাস পর্যন্ত তাঁর হাতে বধ হওয়া সৈনিকের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৫৭। তিনি লেফটেন্যান্ট পদে পদোন্নতি পান। এভাবেই তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান। একপর্যায়ে পাভলিচেঙ্কো গুরুতর আহত হলে তাঁকে রণক্ষেত্র থেকে প্রত্যাহার করা হয়। তবে এর মাঝেই তাঁর বধ করা শত্রুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০৯-এ। যাঁদের ভেতর শত্রুপক্ষের ৩৬ জন দক্ষ স্নাইপারও ছিলেন।
রণক্ষেত্র থেকে প্রত্যাহারের পর পাভলিচেঙ্কোকে রেড আর্মির মেজর পদে উন্নীত করা হয়। এরপর তিনি স্নাইপিং প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন।যুদ্ধ চলাকালে তার এই অসাধারণ বীরত্বগাথা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন রুজভেল্টের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে প্রথম সোভিয়েত নাগরিক হিসেবে হোয়াইট হাউজে যান লুডমিলা।
তৎকালীন মার্কিন ফার্স্ট লেডি ইলিনর রুজভেল্টের উদ্যোগে আমেরিকার বিভিন্ন প্রদেশে ঘুরে সাধারণ আমেরিকান নারীদের মাঝে তার যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দেন পাভলিচেঙ্কো। তবে নারীদের পোশাকের প্রতি আমেরিকানদের ও গণমাধ্যমের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে খানিকটা ক্ষুব্ধ হন তিনি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে পুনরায় কিয়েভ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ইতিহাসবিদ হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন। পাভলিচেঙ্কো একবার সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা ‘হিরো অব সোভিয়েত ইউনিয়ন’ এবং দুবার সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘অর্ডার অব লেনিন’ লাভ করেন।
লুডমিলা পাভলিচেঙ্কোর আত্মজীবনী ‘লেডি ডেথ : দ্য মেমোরিজ অব স্তালিন’জ স্নাইপার’ প্রকাশিত হলে বেশ সাড়া ফেলে। তাঁর বীরত্বের গল্প শুনে ফ্যাসিবিরোধী সংগীতশিল্পী উডি গুথরি ‘মিস পাভলিচেঙ্কো’ শিরোনামে একটি গান উৎসর্গ করেন।
১৯৭৪ সালের ১০ অক্টোবর পাভলিচেঙ্কো স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্মরণে ১৯৭৬ সালে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ বিশেষ স্ট্যাম্প ইস্যু করে। ২০১৫ সালে রুশ-ইউক্রেনীয় যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হয় তাঁর কাহিনী অবলম্বনে বায়োপিক ‘ব্যাটল ফর সেভাস্তোপোল’, যা ব্যাপক ব্যবসাসফল হয়।


