২০২৩ সালের শেষ থেকে শুরু হওয়া প্রবালপ্রাচীর ব্লিচিং এখন পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় ৮৪ শতাংশ প্রবাল রিফকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, এটিকে সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণের ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্তৃত ও গভীর সংকট বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) এবং যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NOAA) জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ১০০টিরও বেশি দেশের উপকূলবর্তী অঞ্চল এই সংকটে আক্রান্ত হয়েছে। এ ঘটনাকে চতুর্থ বৈশ্বিক প্রবাল ব্লিচিং ইভেন্ট হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। পূর্ববর্তী ইভেন্টগুলো ১৯৯৮, ২০১০ ও ২০১৫–২০১৭ সালের মধ্যে ঘটেছিল। তবে এবার ক্ষতির পরিমাণ ও বিস্তৃতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
কীভাবে ঘটে এই ব্লিচিং?
বিজ্ঞানীরা জানান সমুদ্রজলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ কয়েক ডিগ্রি বেড়ে গেলে প্রবাল তাদের শরীরের অভ্যন্তরে সহাবস্থানে থাকা জুজানথেলি নামক শৈবালকে ত্যাগ করে। এই শৈবালই প্রবালকে খাবার ও রঙ সরবরাহ করে। এর অনুপস্থিতিতে প্রবাল সাদা হয়ে যায়—এই অবস্থাকেই ‘ব্লিচিং’ বলা হয়। দীর্ঘমেয়াদে এই অবস্থা টিকে থাকলে প্রবাল মারা যায়।
NOAA-র সিনিয়র সামুদ্রিক বিজ্ঞানী ড. জেনিফার কার্সন বলেন, “এই মুহূর্তে আমরা প্রবালপ্রাচীরের একটি ‘স্লো মোশন কোলাপ্স’ প্রত্যক্ষ করছি। এটা শুধু প্রবালের জন্য নয়, বরং সামুদ্রিক খাদ্যচক্র, উপকূলীয় জীবন ও মানুষের জন্যও এক অশনি সংকেত।”
অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ, ক্যারিবিয়ান অঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবাল প্রাচীর, হাওয়াই, ফিজি এবং মালদ্বীপের মতো অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এই তালিকায় উপমহাদেশের বঙ্গোপসাগরও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন দ্বীপে অবস্থিত প্রবাল রিফসমূহ ভবিষ্যতে উচ্চ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদা রহমান বলেন, “ব্লিচিং ইভেন্টটি বাংলাদেশের উপকূলীয় প্রতিবেশেও প্রভাব ফেলবে। প্রবালের ক্ষয় মানে উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য ও মাছের সংখ্যায় ব্যাপক হ্রাস।”
এই বিপর্যয়ের অন্যতম চালক হলো চলমান El Niño পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ধারাবাহিক প্রভাব। IPCC রিপোর্ট অনুসারে ২০২৩ সাল ছিল এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা সবচেয়ে উষ্ণতম বছর, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে সাগরের তাপমাত্রায়।
বর্তমানে NOAA ও UNEP সহ বিভিন্ন সংস্থা ক্ষতিগ্রস্ত রিফগুলোর জন্য জেনেটিকালি রেজিলিয়েন্ট প্রবাল রোপণ, সামুদ্রিক সুরক্ষিত অঞ্চল সম্প্রসারণ, ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণমূলক রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচি শুরু করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা একমত যে, যদি কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে বৈশ্বিক পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও মারাত্মক ব্লিচিং অনিবার্য।
বিশ্বব্যাপী প্রবাল ব্লিচিং শুধুমাত্র একটি পরিবেশগত ইভেন্ট নয়, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের জ্যান্ত প্রমাণ এবং আমাদের সামুদ্রিক ভবিষ্যতের এক গভীর সতর্কবার্তা। মানবজাতির ওপর এর প্রত্যক্ষ প্রভাব না থাকলেও, এর পরোক্ষ প্রভাব মাছের ঘাটতি, জীববৈচিত্র্য হ্রাস, এবং উপকূলীয় ঝুঁকি—অবধারিতভাবে মানব জীবনের উপরই ফিরে আসবে।


