“… আমাদের পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এনসিপির উত্থানের মধ্যে রয়েছে অভিনবত্বের আকর্ষণ এবং অতীতে শাসনকার্যে জড়িত থাকার কোনো দায় বহন না করার সুবিধা। এই পুঁজি কাজে লাগাতে হলে এনসিপির উচিত হবে ইতিহাস নিয়ে পুরোনো বিতর্কে জড়ানোর পরিবর্তে নিজেদের ভবিষ্যতের দল হিসেবে উপস্থাপন করা। এ পর্যন্ত কিছু ছাত্রনেতা সংবিধান পুনর্লিখন এবং দ্বিতীয় রিপাবলিক ঘোষণা নিয়ে অনেক বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। বাংলাদেশের সংবিধানের মূল ভিত্তি—চার মৌলিক নীতিকে প্রতিস্থাপনের বিষয়ে দলটির পাঁচ দফা ঘোষণাটি যখন প্রকাশিত হচ্ছে, তখন এটিকে মূলত শব্দগত একটি খেলা বলে মনে হচ্ছে। এটি এমন কিছুই বলছে না, যা ইতিমধ্যে থাকা মূল সংবিধানের মৌলিক নীতিগুলোতে নেই। যেমন ‘বহুত্ববাদ’ গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার অন্তর্নিহিত ধারণা। ‘সাম্য’ ও ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’ সমাজতন্ত্রের ধারণার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সাংবিধানিক দ্বান্দ্বিকতায় জড়িত হওয়ার এই উদ্যোগ জাতীয় লক্ষ্যকে পরিচালিত করা মৌলিক মূল্যবোধগুলোকে পুনর্নির্ধারণ করার চেয়ে ইতিহাসের পুনর্ব্যাখ্যার আকাঙ্ক্ষা দ্বারা বেশি পরিচালিত বলে মনে হয়। ইতিহাস নিয়ে এভাবে বিতর্কে ছাত্ররা জড়িয়ে পড়ার কারণে বৈষম্যবিহীন একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা কীভাবে তৈরি করা যায়, সেটি তাদের পক্ষে স্পষ্ট করে বলার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।
এই অতীতমুখিতা ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে নিজেদের প্রাথমিক দায়িত্ব থেকেও তাঁদের বিচ্যুত করেছে। সেটি হলো, বাংলাদেশের বিধ্বস্ত আর্থসামাজিক পরিবেশে স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে সহায়তা করা। তারা ছাত্রসংগঠনগুলোকে সংগঠিত করে দুর্বল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারত। তারা দুর্বল গোষ্ঠীর সমস্যার প্রতি মনোযোগ দিয়ে বৈষম্যকে চ্যালেঞ্জ করার সক্রিয় অঙ্গীকার প্রদর্শন করতে পারত এবং এ ধরনের গোষ্ঠীগুলোকে নিপীড়ন ও শোষণের হাত থেকে রক্ষায় আরও সক্রিয় হতে পারত। শিক্ষার্থীদের এ ধরনের উদ্যোগ কেবল কথার মাধ্যমে নয়; বরং কাজের মাধ্যমে পরিবর্তনের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একটি নতুন শক্তি হিসেবে দৃশ্যমানতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা দুটিই দিত। নাগরিক সুশাসনে এ ধরনের আরও কার্যকর ভূমিকা তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয়কে আরও স্পষ্ট করতে সহায়তা করত এবং ছাত্রদের গণ্ডির বাইরেও সমর্থন বৃদ্ধি করত।
রাজনীতির চিরন্তন শিক্ষা হলো সঠিক সময়ে সঠিক লড়াই করা। গত সাত মাসে ভবিষ্যতের জন্য একটি পরিষ্কার দর্শন আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হওয়ায় ছাত্র আন্দোলনের দীপ্তি কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে। জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এনসিপির সক্ষমতা কমছে। … ছাত্রদের মধ্যে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে এবং নিজেদের প্রভাব আরও বিস্তৃত করতে এনসিপিকে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের শক্তিকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। এটি করতে নিজেদের রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং জনগণের সামনে একটি নতুন কর্মসূচি তুলে ধরার অঙ্গীকার করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে এনসিপি ইতিমধ্যেই অপ্রয়োজনীয়ভাবে সেই ইতিহাসকেন্দ্রিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে, যে বিতর্ক আরও কার্যকর দ্বিদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আবির্ভাবকে অতীতে থমকে দিয়েছিল।
এনসিপি দ্রুত নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা (খুব বেশি নয়) এবং ভারতের প্রতি বিরূপ মনোভাবের মতো বিষয়গুলোতে রাজনৈতিকভাবে ইতিমধ্যে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরেছে। এ বিষয়ে দলটির অবস্থান জামায়াতে ইসলামীর কাছাকাছি। এ সময়ে এ ধরনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামীকে বিএনপির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। … নির্বাচন যখনই আয়োজন করা হোক, তার প্রস্তুতির জন্য এনসিপি যখন অগ্রসর হচ্ছে, তখন দলটি বাংলাদেশের রাজনীতির এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে, দুঃখজনকভাবে কোনো সংস্কার কমিশন যা এখনো সমাধান করেনি। নির্বাচনে লড়তে তাদের প্রয়োজন বড় অঙ্কের তহবিল। নিজেদের জন্য স্বচ্ছ তহবিল গঠন করে তারা অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য অনুসরণীয় একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। …”


