ইউরোপে ধর্ম ও রাষ্ট্রের সংঘাত ও সমঝোতা

ইউরোপে ধর্ম, আইন ও রাজনীতির সম্পর্ক এক অনন্য ও জটিল বাস্তবতা, যা বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেকটাই আলাদা। এখানে রাজনৈতিক জীবনে ধর্মীয় প্রভাব তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের মুখপাত্র আলাস্টেয়ার ক্যাম্পবেলের বিখ্যাত উক্তি ‘রাজনীতিবিদরা সাধারণত গড নিয়ে কথা বলেন না’ ইউরোপের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি স্পষ্ট প্রতিফলন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউরোবারোমিটার জরিপে দেখা যায়, ধর্মের রাজনৈতিক মূল্যবোধ ও ভোটারের আচরণে প্রভাব খুব সীমিত। আমেরিকার মত শক্তিশালী ‘রিলিজিয়াস রাইট’ বা ইসলামী দেশগুলোর মত ধর্মীয় বিতর্ক ইউরোপের রাজনীতিতে নেই বললেই চলে।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপে ধর্ম ও রাজনীতির এই দীর্ঘস্থায়ী দূরত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অভিবাসন অন্যতম কারণ হিসেবে ধর্মকে আবারও জনজীবনের কেন্দ্রে ফিরিয়ে এনেছে। মুসলিম সংখ্যালঘুরা ধর্ম অবমাননা ও বাকস্বাধীনতা নিয়ে প্রতিবাদ করেছে, ক্যাথলিক নেতারা সমকামী বিয়ে ও গর্ভপাত নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কে হস্তক্ষেপ করেছেন, আবার রক্ষণশীলরা ইউরোপের খ্রিস্টান অতীত হারিয়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রাজনৈতিক বিজ্ঞানী এরিক কাউফম্যান দাবি করেছেন, ধর্মবিশ্বাসীদের উচ্চ জন্মহার ইউরোপের ধর্মনিরপেক্ষতাকে শতকের শেষে উল্টে দিতে পারে।

ইউরোপীয় ধর্মনিরপেক্ষতার শিকড় খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বে ‘সিজারকে সিজারের এবং ঈশ্বরকে ঈশ্বরের’ নীতিতে থাকলেও, এর প্রকৃত ভিত্তি ১৬ ও ১৭ শতকের ধর্মযুদ্ধের যন্ত্রণায় নিহিত। সেই সময়ের ভয়াবহ সংঘাত ইউরোপকে এমন রাজনৈতিক কাঠামো গড়তে বাধ্য করেছিল, যাতে ধর্মীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়ার শান্তিচুক্তি ইউরোপে সার্বভৌম রাষ্ট্র ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেয়। গ্রোটিয়াস, হবস, লক, হিউমের মতো চিন্তাবিদরা ধর্ম ও রাজনীতিকে আলাদা করার দর্শন গড়ে তোলেন।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও, ইউরোপে ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়। অনেক দেশে খ্রিস্টান ধর্মীয় প্রতীক, উৎসব, এমনকি সরকারি অর্থায়নে চার্চ ট্যাক্স, ধর্মীয় স্কুল ও হাসপাতাল বিদ্যমান। জাতীয় পতাকায় ক্রুশ, সরকারি ছুটিতে খ্রিস্টান উৎসব, সাংবিধানিকভাবে খ্রিস্টধর্মের উল্লেখ-এসবই ইউরোপের ধর্ম-রাষ্ট্র সম্পর্কের ‘আধা-ধর্মনিরপেক্ষ’ চরিত্রকে তুলে ধরে।

আধুনিক ইউরোপে অভিবাসনের ফলে ধর্মীয় বৈচিত্র্য বেড়েছে। একসময় জাতীয়তা ও ধর্ম ছিল সমার্থক-স্পেন মানেই ক্যাথলিক, সুইডেন মানেই লুথারান, গ্রিস মানেই গ্রীক অর্থডক্স। এখন বহু জাতিগোষ্ঠী ও নাস্তিক-অজ্ঞেয়বাদীর সংখ্যা বাড়ায় ধর্মীয় পরিচয় আর জাতীয় পরিচয়ের সমার্থকতা হারিয়েছে। ফলে ধর্মীয় প্রতীক-যেমন স্কুলে ক্রুশ, সরকারি অনুষ্ঠানে প্রার্থনা-নিয়ে আইনি ও সামাজিক বিতর্ক বেড়েছে। আইরিশ পুলিশে শিখ অফিসারের পাগড়ি, ইতালির স্কুলে ক্রুশ, ইউরোপিয়ান কোর্টে বাইবেলের শপথ-এসবই এখন চ্যালেঞ্জের মুখে।

মুসলিম সম্প্রদায়ের দৃশ্যমান ধর্মীয় প্রতীক যেমন হিজাব, বোরকা ইত্যাদি ইউরোপের কিছু দেশে ধর্মীয় প্রতীক নিষিদ্ধ করার প্রবণতা বাড়িয়েছে। ২০০৪ সালে ফ্রান্সে সব ধরনের ‘প্রদর্শনযোগ্য’ ধর্মীয় প্রতীক স্কুলে নিষিদ্ধ হয়; বার্লিনে সরকারি অফিসে, ডেনমার্কে আদালতে ধর্মীয় প্রতীক নিষিদ্ধ করা হয়। যদিও লক্ষ্য ছিল মুসলিম প্রতীক, বাস্তবে সব ধর্মীয় প্রতীকই নিষিদ্ধ হচ্ছে, ফলে ধর্ম আরও ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ হচ্ছে।

ধর্ম ও রাজনীতির আলাদা রাখার যে সামাজিক রীতি ছিল, এখন তা স্পষ্ট আইনি নিয়মে পরিণত হচ্ছে। ব্লাসফেমি আইন বাতিল, নাগরিকত্ব পরীক্ষায় ধর্ম-রাষ্ট্র বিচ্ছিন্নতার স্বীকৃতি, সমতার নীতিতে ধর্মীয় অনুশীলন সীমাবদ্ধ করা-এসবই ইউরোপের নতুন বাস্তবতা। অনেক দেশেই এখন নাগরিকত্ব পেতে ধর্মীয় ও সামাজিক সমতার নীতিগুলো মেনে নিতে হয়।

বহুত্ববাদের চাপে ইউরোপে ধর্মের প্রতীকী ও আইনি ভূমিকা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। একসময় ধর্ম ছিল জাতীয় ঐক্যের প্রতীক, এখন তা বিতর্কিত। নতুন প্রজন্ম, অভিবাসী ও নাস্তিকদের কারণে ধর্মীয় প্রতীকের গ্রহণযোগ্যতা কমছে। সরকারগুলো ধর্মকে ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।

ইউরোপীয় ধর্ম-রাষ্ট্র সম্পর্কের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এটি আমেরিকার মত সম্পূর্ণ আলাদা। আমেরিকা একটি ধর্মীয় বহুত্ববাদী দেশ যেখানে ‘চার্চ ও স্টেট’ সম্পূর্ণ আলাদা করার কঠোর আইন রয়েছে। ইউরোপে যদিও অনেক দেশেই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের মধ্যে কিছু আইনি ও সাংস্কৃতিক সংযোগ রয়ে গেছে। যেমন, ইংল্যান্ডে অ্যাঙ্গলিকান চার্চ সরকারি স্বীকৃতি পায়, অনেক দেশে চার্চ ট্যাক্স আদায় করা হয়, সরকারি স্কুল ও হাসপাতালগুলোতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা থাকে। ইউরোপে ধর্মীয় উৎসবগুলো জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়, যা আমেরিকার তুলনায় অনেক বেশি প্রকাশ্য।

ইউরোপে ধর্ম ও রাজনীতির সম্পর্কের এই পরিবর্তন নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রভাব হারাচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বেড়ে যাওয়ার কারণে ধর্মীয় অধিকার ও স্বাধীনতার প্রশ্নগুলো জটিল হচ্ছে। অভিবাসন ও গ্লোবালাইজেশনের ফলে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলো নতুন রাজনৈতিক দাবিতে এগিয়ে আসছে, যা ইউরোপীয় সমাজের ঐতিহ্যগত ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাংস্কৃতিক সংহতিকে প্রভাবিত করছে।

ইউরোপে ধর্ম, আইন ও রাজনীতির সম্পর্ক একটি দীর্ঘ ইতিহাসের ফলাফল। ধর্মনিরপেক্ষতা এখানে সংঘাত এড়ানোর উপায় হিসেবে জন্ম নিয়েছিল, এখন তা আরও কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে ইউরোপের জনজীবনে ধর্মের ভূমিকা আরও সীমিত হবে বলেই মনে হচ্ছে। তবে এই পরিবর্তনই হয়তো ইউরোপের বহুত্ববাদ, সমতা ও উদারনৈতিকতার স্বার্থেই জরুরি। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মধ্যে সামঞ্জস্য রেখে একটি নতুন ইউরোপীয় পরিচয় গড়ে তোলা হবে, যেখানে ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় হলেও রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে তার প্রভাব সীমিত থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন