ইউক্রেনে যুদ্ধ ও অস্ত্রবিরতির নেপথ্যে কী : মোজাম্মেল হক , মার্কিন প্রবাসী লেখক

” … ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন জনগণের ট্যাক্সের অর্থ আটলান্টিকের ওপারে ভিন্ন এক মহাদেশের ভিন দেশের যুদ্ধে গোলাগুলির পেছনে উড়িয়ে দিতে রাজি নন। যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সর্বাগ্রে, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’।…তিনি এমন নীতি অনুসরণ করতে রাজী নন, যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও পারমাণবিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। কাজেই মি. ট্রাম্প প্রথমবার ফোনালাপেই পুতিনকে অস্ত্রবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু পুতিন সহজ মানুষ নন। তার কথা হচ্ছে শান্তি স্থাপনে তিনি আগ্রহী, কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা তিক্ত। ফ্রান্স এবং জার্মানীর দৌত্যে মিনস্ক ১ এবং মিনস্ক ২ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তাঁর পূর্ণ সম্মতি ও সহযোগিতা ছিল।

ইউক্রেন কথা দিয়েছিল, রুশ জাতিসত্বা অধ্যুষিত ডোনেটস্ক পিপলস রিপাব্লিক এবং লুহানস্ক পিপলস রিপাব্লিক ইউক্রেনের কাঠামোর ভেতরে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন উপভোগ করবে। জাতিগত রুশ জনগণ বৈষম্যের শিকার হবে না। নব্য নাজীদের রাশিয়া বিরোধী তৎপরতা নিষিদ্ধ হবে। ইউক্রেন যথার্থ নিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করবে, কোন সামরিক জোটে অন্তর্ভুক্ত হবে না। বাস্তবে দেখা গেল সবই উল্টো। ইউক্রেনের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট পেট্রো পোরশেঙ্কো পরে স্বীকার করেছেন ডোনেটস্ক এবং লুহানস্ক অঞ্চল পুনর্দখলের প্রস্তুতি এবং সামরিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য সময় দরকার ছিল। চুক্তি করেছিলেন হাতে কিছুটা সময় পাওয়ার জন্য। মধ্যস্থতাকারী ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ওলান্দে এবং জার্মানীর চ্যান্সেলর মার্কেলও তা জানতেন।

পুতিনের মতে, পশ্চিমা শক্তি ইউক্রেনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। রাশিয়ার সীমান্তে ন্যাটো জোটের প্রত্যক্ষ সামরিক উপস্থিতির সাথে রাশিয়ার অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িত। ন্যাটো জোট রাশিয়ার ঘাড়ের উপর শ্বাস ফেলবে পুতিন তা মানতে পারেন না।…ইতিহাস হচ্ছে, নেপোলিয়ান এবং হিটলার ইউক্রেনে নিজ অবস্থান সংহত করে রাশিয়ার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নয়, পুতিন অন্তর্নিহিত মূলগত সমস্যার সমাধান চান।

… সে ক্ষেত্রে প্রাথমিক পদক্ষেপ হচ্ছে ন্যাটো জোটের পূর্বমুখী সম্প্রসারণের অবসান, ইউক্রেনের নিরপেক্ষতা ও অসামরিকীকরণ (demilitarization)। তিনি কোন অজুহাতে ইউক্রেনে ন্যাটোভুক্ত দেশের সেনা উপস্থিতি মানবেন না।… ইউক্রেনের সামরিক সামর্থ্য প্রতিরক্ষার সীমা অতিক্রম করতে পারবে না। ২০২২ সালে লুহানস্ক, ডোনেটস্ক, খারসন এবং ঝাপরিঝিয়ার জনগণ ইউক্রেন ত্যাগ করে রেফারেন্ডামের মধ্য দিয়ে স্বেচ্ছায় রাশিয়ার সাথে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাংবিধানিকভাবে এখন তা রাশিয়ার অংশ।

মি. ট্রাম্পের বুঝতে অসুবিধে হয়নি, ইউক্রেনকে ‘নিরাপত্তা নিশ্চয়তা’ দেয়ার অন্য অর্থ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া। পুতিনের বিবেচনা তাই।কিন্তু যে জেলেনস্কি এবং তার ইউরোপীয় পৃষ্ঠপোষকেরা যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাবে গড়িমসি করছিলেন, তারাই এখন উঠে পড়ে লেগেছেন ট্রাম্পের অস্ত্রবিরতির প্রস্তাব কত দ্রুত কার্যকর করা যায়। কারণ ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিন এখন চালকের আসনে। … সামরিক পোষাক গায়ে পুতিন প্রথমবারের মত কুরস্ক ঘুরে এসেছেন। যুদ্ধের গতিবেগ বজায় রেখে ত্বরিত অগ্রসর হবেন, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্কে ফেরৎ যাবেন, এ নিয়ে উভয় সংকট। ট্রাম্পের প্রস্তাবে রাজি হলে রাশিয়ার উপর পশ্চিমা বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার অবসান হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ব্যাংকে গচ্ছিত ৬০০ বিলিয়ন রিজার্ভের অর্থ ফেরত পেতে তা সাহায্য করবে।

… পুতিন ইউক্রেন প্রশ্নে পশ্চিম ইউরোপের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের মতপার্থক্য সম্পর্কে সজাগ। ইউরোপের ইচ্ছা যুদ্ধ অব্যহত থাকুক, যেন ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া রক্তক্ষরণ হয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়া একক সামর্থ্যে যুদ্ধ চালু রাখার ক্ষমতা ইউরোপের নেই। ইউরোপ সুযোগ খুজছে, কি করে ট্রাম্পকে পুতিনের বিরুদ্ধে লাগিয়ে রাখা যায়। ট্রাম্প চান যুদ্ধের অবসান। তিনি মনে করেন ইউক্রেন যুদ্ধ লোকসানী কারবার, যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োেগ বিশাল, মুনাফা স্বল্প, ফায়দা প্রধানত ইউরোপের। কিন্তু তাদের বিনিয়োগ নামমাত্র ।

রাশিয়া নয়, ট্রাম্প মনে করেন চীন হচ্ছে প্রধান প্রতিযোগী। চীন উঠছে, উর্ধগতি অব্যাহত থাকলে সে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে প্রধান বিশ্বশক্তি রূপে আবির্ভূত হবে। রাশিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের মত বৈশ্বিক মতাদর্শগত চ্যালেঞ্জ নয়, ভাংগনের পর পূর্ব ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার অর্থনৈতিক পশ্চাদভূমি হারিয়ে সে বিপাকে। পুতিন তাকে নিজের পায়ের উপর দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন। তাকে চীনের দিকে ঠেলে দেওয়া নির্বোধের কাজ। ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেছেন, ‘চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক হচ্ছে বাধ্যতামূলক বৈবাহিক সম্পর্ক, তাঁর পূর্বসুরীর ভুল সিদ্ধান্তের ফল।’ তিনি বলেছেন, ‘আমরা চাই না রাশিয়া ও চীন একত্রিত হোক।’ ‘চীনকে একপাশে সরিয়ে রাখা উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু তা হতেও পারে।’ ‘রাশিয়ার লোক সংখ্যা স্বল্প, বিশ্বের বৃহত্তম দেশ। চীন হচ্ছে আয়তনে ক্ষুদ্র, জনসংখ্যা বিপুল।তাদের স্বাভাবিক অবস্থান ও প্রবণতা পারস্পরিক বৈরিতার।’

পুতিন জানেন, ট্রাম্পের সাথে বিরোধে না জড়িয়ে সুসম্পর্ক তৈরি করতে পারলে রাশিয়া ঝামেলামুক্ত হবে। পশ্চিমা মিত্র শিবিরে ফাটল বড় হবে। যে ন্যাটো জোট তার মাথাব্যথার কারণ তাতে ভাঙ্গন ধরাও সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রবিহীন সামরিক জোট নখদন্তহীন বুড়ো বাঘ, যার শিকার ধরার ক্ষমতা নেই। পুতিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমঝোতা ও সুসম্পর্ক সৃষ্টির পথে ইউরোপীয়দের কাঁটা বিছানোর সুযোগ করে দিতে চান না। তিনি ট্রাম্পের সাথে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের উপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। বলেছেন, ইউক্রেনের তুলনায় খনিজ সম্পদে রাশিয়া অনেক বেশি সমৃদ্ধ। এ সবের উত্তোলনে মার্কিন কর্পোরেটগুলিকে তিনি সুযোগ দেবেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তা লুফে নিয়েছেন। ট্রাম্প তার পররাষ্ট্র নীতিতে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন সেসব খনিজ সম্পদের উৎসের নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ নিশ্চিত করার উপর, যা সর্বশেষ প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির বিকাশে নির্ধারক ভূমিকা নেবে। অন্তহীন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জেরবার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে উদ্ধার ও সুদিন ফিরিয়ে আনতে চান। কিন্তু পুতিনের জন্য মুস্কিল হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প একেক সময় একেক কথা বলেন। তার লক্ষ্য হচ্ছে বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে নিজের জন্য যথাসম্ভব ফায়দা তোলা। বর্তমানে ট্রাম্প এমন ভূমিকায় আছেন, তিনি খেলোয়াড় এবং রেফারি শুধু নয়, খেলার নিয়মও বেঁধে দিতে চান। পুতিন নিজেও কম যান না। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত খেলা কোথায় গড়ায়।








LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন