ইতিহাসের পাতায় এক অমোঘ প্রশ্ন, কে ছিলেন ইংল্যান্ডের প্রথম রাজা? আপাতদৃষ্টিতে সরল মনে হলেও এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ইউরোপের এক কোণে লুকিয়ে থাকা সেই পুরোনো রাজ্যগুলোর জটিল রাজনীতি আর ক্ষমতার খেলা উন্মোচিত হয়। বর্তমান পণ্ডিতদের মতে, এই সম্মানের দাবিদার হলেন এথেলস্টান (Aethelstan)।
কিন্তু ‘রাজা’ হতে গেলে ঠিক কী লাগে? কেবল মানুষের ওপর কর্তৃত্ব? নাকি ভূমির দখল? নাকি দুটোই! এই প্রশ্নই মধ্যযুগীয় রাজতন্ত্রের জন্ম ও বিকাশকে বুঝতে সাহায্য করে। আর এই জটিলতার কারণেই প্রথম রাজার পরিচয় নির্ণয় করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ইংল্যান্ডের ইতিহাসই এর জলজ্যান্ত প্রমাণ।
প্রথম রাজার খোঁজ করতে গেলে আমাদের যাত্রা শুরু করতে হবে অ্যাংগেলস)-দের দিয়ে। ইংল্যান্ড (England) নামটিও এসেছে পুরোনো ইংরেজি শব্দ Englaland থেকে, যার আক্ষরিক অর্থ “অ্যাংগেলদের ভূমি”। ৫ম শতাব্দীতে রোমান প্রদেশ ‘ব্রিটানিয়া’-তে স্যাক্সন, জুটস এবং ফ্রিসিয়ানদের সাথে এই জার্মানিক উপজাতিরা আসতে শুরু করে।
৬০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এই জার্মানিক উপজাতি এবং স্থানীয় রোমানো-ব্রিটিশ সংস্কৃতি মিশে গিয়ে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে স্বতন্ত্র রাজ্যগুলো গঠিত হয়। মজার বিষয় হলো, এই রাজ্যগুলো ভৌগোলিক সীমানার চেয়ে বরং একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর ভিত্তিতে গঠিত হয়েছিল। সময় গড়ানোর সাথে সাথে ছোট ছোট রাজ্যগুলো একত্র হয়ে বৃহত্তর রাজ্যের জন্ম দেয় এবং জন্ম হয় তথাকথিত হেপ্টার্কি (Heptarchy) বা সাত রাজ্যের।
হেপ্টার্কি একটি অতি-সরলীকরণ হলেও কেনট, সাসেক্স, ইস্ট অ্যাংলিয়া, নর্থামব্রিয়া, এসেক্স, ওয়েসেক্স এবং মার্সিয়া—এই সাতটি প্রধান রাজ্যই ছিল সেই সময়ের ক্ষমতার কেন্দ্র। প্রতিটি বড় রাজ্যের ভেতরেও ছিল ছোট ছোট রাজ্য, যাদের শাসকরা নিজেদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকত। এই রাজত্বের মূল ভিত্তি ছিল আনুগত্য এবং সুরক্ষার পারস্পরিক সম্পর্ক, যা কর এবং সেবার সমন্বয়ে গঠিত একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করত।
৮ম শতাব্দীতে এই রাজ্যগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে একসময় মার্সিয়া আধিপত্য বিস্তার করে। এই ধরনের শাসককে ধর্মযাজক বিড তাঁর ‘একলেসিয়াস্টিক্যাল হিস্টোরি’তে এমন একজন শাসক হিসেবে বর্ণনা করেছেন যিনি তাঁর নিজের রাজ্যের বাইরের জনগোষ্ঠীর ওপরও “কর্তৃত্ব” বজায় রাখতেন। ৯ শতাব্দীর ‘অ্যাংলো-স্যাক্সন ক্রনিকল’ এই ধারণাকে বোঝাতে ব্রেটওয়ালডা শব্দটি ব্যবহার করে, যা তারা প্রায় ৫ম শতাব্দীর শেষ দিকের শাসকদের ক্ষেত্রেও পূর্বাপেক্ষা প্রয়োগ করেছিল।
মার্সিয়ার সেই আধিপত্যে ফাটল ধরে ওয়েসেক্সের রাজা একগ্বার্টের সময়ে। ৮২৫ খ্রিস্টাব্দে একগ্বার্ট মার্সিয়ানদের ইল্ডেনডনের যুদ্ধে পরাজিত করেন এবং এরপর অন্যান্য প্রধান রাজ্যগুলো তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নেয়। অ্যাংলো-স্যাক্সন ক্রনিকল তাঁকে ব্রেটওয়ালডা হিসেবে চিহ্নিত করে, যা তাঁকে প্রথম ইংল্যান্ডের রাজার দাবিদার করে তোলে।
একগ্বার্টের দাবি আরও জোরালো হয় উত্তরাধিকারের স্থিতিশীলতায়। মার্সিয়া যেখানে শান্তিপূর্ণ উত্তরাধিকার নিয়ে ভুগছিল, সেখানে ওয়েসেক্স ছিল সফল। একগ্বার্টের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র এথেলউলফ সিংহাসনে বসেন, যা ওয়েসেক্সে বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারের নীতিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। এথেলউলফের মৃত্যুর পর তাঁর আরও তিন পুত্র একে একে রাজা হন এবং অবশেষে ৮৭১ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আসেন তাঁর চতুর্থ পুত্র আলফ্রেড, যিনি প্রথম ইংল্যান্ডের রাজার আরেক শক্তিশালী দাবিদার।
আলফ্রেডের রাজা হওয়ার কথা ছিল না। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় তাঁর বড় ভাই এথেলরেড মারা গেলে তিনি ওয়েসেক্সের রাজা হন। রাজা হিসেবে তিনি সেই হানাদারদের বিরুদ্ধে রাজ্যকে রক্ষা করতে থাকেন, যাদের অ্যাংলো-স্যাক্সন ক্রনিকল “গ্রেট হিদেন আর্মি” বলে উল্লেখ করেছে।
৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে ডেন, নরওয়েজিয়ান এবং সুইডিশদের নিয়ে গঠিত এই বাহিনী ইস্ট অ্যাংলিয়ায় পৌঁছায় এবং এক দশকের মধ্যে ওয়েসেক্স ছাড়া আর সব রাজ্য দখল করে নেয়। ৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে এডিংটনের যুদ্ধে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান বাহিনীকে পরাজিত করার পর আলফ্রেড তাদের নেতা গুথ্রুমের সাথে একটি শান্তি চুক্তি করেন, যা ওয়েসেক্স এবং ভাইকিং-নিয়ন্ত্রিত এলাকার মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক সীমানা নির্ধারণ করে, এই ভাইকিং এলাকা পরে ডেন’ল নামে পরিচিত হয়।
এই উত্তর দিকের স্থায়ী স্ক্যান্ডিনেভিয়ান উপস্থিতি এবং ভাইকিং আক্রমণ আলফ্রেডকে রাজ্য সুরক্ষিত করতে অনুপ্রাণিত করে। তিনি সামরিক বাহিনী সংস্কার করেন, বার্হস নামক প্রতিরক্ষামূলক বসতি স্থাপন করেন এবং উপকূল রক্ষা করার জন্য একটি নৌবাহিনীও গঠন করেন। এসবের পাশাপাশি আলফ্রেডের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজগুলো ইংল্যান্ডের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ে অবদান রাখে বলে মনে করা হয়। আর তাঁর নিজস্ব সনদগুলোতে “অ্যাংলো-স্যাক্সনদের রাজা” হিসেবে তাঁর পদবী ব্যবহারের কারণেও তিনি প্রথম ইংল্যান্ডের রাজা হওয়ার যোগ্য দাবিদার।
৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে আলফ্রেড মারা যান এবং তাঁর পুত্র এডওয়ার্ড দ্য এল্ডার সিংহাসনে বসেন। এডওয়ার্ড ৯২৪ খ্রিস্টাব্দে মারা যাওয়ার পর তাঁর পুত্র এথেলস্টান ৯২৫ খ্রিস্টাব্দে রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হন।
দাদু আলফ্রেড এবং বাবা এডওয়ার্ডের মতো এথেলস্টানও শুরুতে “অ্যাংলো-স্যাক্সনদের রাজা” ছিলেন। তবে তাঁর রাজত্বের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় ৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের ব্রুনানবুর্গের যুদ্ধের পর। রাজা হওয়ার পরের দশকে তিনি ইয়র্ক এবং নর্থামব্রিয়াকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন।
৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে ওয়েলশ, স্কট এবং ভাইকিং ডাবলিনের রাজারা একত্রিত হয়ে এথেলস্টানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ব্রুনানবুর্গের সঠিক অবস্থান এখনো অজানা, তবে অনেক পণ্ডিত এটিকে ব্রিটিশ ইতিহাসের অন্যতম সংজ্ঞায়িতকারী ঘটনা মনে করেন। অ্যাংলো-স্যাক্সন ক্রনিকলের একটি কবিতা সেই যুদ্ধকে বর্ণনা করে কিভাবে ওয়েস্ট স্যাক্সনরা তাদের শত্রুদের হত্যা করেছিল, যেখানে পাঁচজন বিরোধী রাজা এবং সাতজন আর্ল নিহত হয়েছিল। কবিতাটি জানায়, “এই দ্বীপে এর আগে এত বড় গণহত্যা আর হয়নি।”
অধ্যাপক কার্ল শুমেকার সংক্ষেপে বলেন, “অন্যান্য দাবিদারদের পক্ষে যুক্তি থাকা সত্ত্বেও, প্রমাণের ভার এথেলস্টানের দিকেই বেশি।এথেলস্টানই ইয়র্ক জয় করে, সেখানকার ভাইকিং রাজ্যকে পরাজিত করে এবং উত্তরকে ইংরেজ শাসনের অধীনে নিয়ে আসেন। তাঁর রাজত্বের শেষে তিনি তাঁর পূর্বসূরিদের চেয়ে বেশি আমলাতান্ত্রিক এবং প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণ অর্জন করেছিলেন।”
ব্রুনানবুর্গের যুদ্ধে এথেলস্টানের বিজয়ই ‘অ্যাংলো-স্যাক্সনদের রাজা’-র কর্তৃত্বকে স্কটল্যান্ড এবং ওয়েলস পর্যন্ত প্রসারিত করে। এটিই তাঁর শাসনকে ‘ইংলিশদের রাজা’ হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। এই বিজয়ের মাত্র দুই বছর পরেই তিনি মারা যান, কিন্তু বহু ঐতিহাসিকের কাছে এই বিজয়ই তাঁকে ইংল্যান্ডের প্রথম সত্যিকারের রাজা করে তোলে।


