আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (ASK) প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বছর প্রতি মাসে গড়ে ১৯ জন নারী স্বামীর হাতে নিহত হয়েছেন।
গত ১৩ আগস্ট রাতে রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় মাত্র ২৫ বছর বয়সী চার সন্তানের মা সায়েদা ফাহমিদা তাহসিন কেয়া নিহত হন। পরিবারের অভিযোগ তাঁকে হত্যা করেছেন স্বামী সিফাত আলী। প্রথমে বিষয়টিকে আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন তিনি। কেয়ার বাবা-মায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, সেদিন রাতে তিনি রান্নাঘরে মাংস রান্না করছিলেন। “আধা মাংস চুলায় দেওয়া ছিল, বাকিটা এখনো রাখা। এমন অবস্থায় হঠাৎ করে কীভাবে আত্মহত্যা সম্ভব?”—প্রশ্ন তোলেন তাঁরা।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কেয়ার বড় মেয়ে জানিয়েছে সেদিন সিফাত বাসায় ফিরে মায়ের সঙ্গে ঝগড়ায় জড়িয়ে তাঁকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন। পরে ঘরের দরজা বন্ধ করে দেন। কিছু সময় পর কেয়ার পরিবারকে ফোন করে জানান তিনি অসুস্থ। কিন্তু হাসপাতালে ছুটে গিয়ে পরিবার জানতে পারে কেয়া মারা গেছেন। এরপর সিফাত লাশ ফেলে রেখে পালিয়ে যায়, সন্তানদের দিয়ে যায় তাঁর বোনের কাছে।
এর ঠিক এক সপ্তাহ আগেই গাজীপুরের কাশিমপুরে আরেক তরুণী মা দুই সন্তানের জননী ১৯ বছরের জেমি স্বামী রাকিব হাসানের হাতে বালিশ চাপা দিয়ে খুন হন বলে অভিযোগ ওঠে।
এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তবে অধিকারকর্মীদের মতে, স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন হওয়া বাংলাদেশে নিত্যদিনের বাস্তবতা। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ৩৬৩টি গৃহহিংসার ঘটনা রেকর্ড হয়েছে, যেখানে ৩২২ জন নারী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৩৩ জনকে হত্যা করেছে তাঁদের স্বামী, ৪২ জনকে শ্বশুরবাড়ির লোকজন, আর ৩৩ জনকে নিজের পরিবারের সদস্যরা। অর্থাৎ চলতি বছরে প্রতি মাসে গড়ে ১৯ জন নারী স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সহিংসতার বিষয়ে ১৭,৩৪১টি কল এসেছে, এর মধ্যে স্বামীর নির্যাতনের অভিযোগ ৯,৩৯৪টি। একই সময়ে জাতীয় মহিলা ও শিশু নির্যাতন নিরসন সেল (১০৯)-এ ২৯,১৬১টি শারীরিক নির্যাতন ও ১৯,৫৮৪টি মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ রেকর্ড হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ‘ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০২৪’-এ আরও ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ২৭,৪৭৬ নারীর মধ্যে ৭০ শতাংশ জানিয়েছেন, জীবনে অন্তত একবার কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের ৫৪ শতাংশ বলেছেন, স্বামী থেকেই তাঁরা শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। কিন্তু এর বিপরীতে ৬৪ শতাংশ নারী এসব ঘটনা কাউকে জানান না, আর মাত্র ৭.৪ শতাংশ আইনি পদক্ষেপ নেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নীরবতার মূল কারণ হলো পারিবারিক সুনামের ভয়, সন্তানদের ভবিষ্যৎ চিন্তা এবং সমাজে নির্যাতনের স্বাভাবিকীকরণ।মানবাধিকারকর্মী শাহীন আনাম বলেন, “যদি স্বামী হাত তোলে এবং বড় কোনো আঘাত না হয়, অনেক সময় পরিবার এটিকে প্রতিবাদযোগ্য বলে মনে করে না। গরিব পরিবারের মেয়েরা আরও বেশি অসহায় কারণ বাবা-মা সমাজের ভয়ে ও আর্থিক অক্ষমতায় মেয়েকে ফিরিয়ে নিতে চান না।”
বাংলাদেশ ১৯৭৯ সালে সিডও (CEDAW) এবং ১৯৮৯ সালে শিশুর অধিকার সনদে সই করেছে। এসব প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে সরকার ২০১০ সালে “গৃহহিংসা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন” প্রণয়ন করে। আইনে সুরক্ষা আদেশ, বসবাসের অধিকার, ক্ষতিপূরণ এবং সন্তানের হেফাজতের মতো বিধান রয়েছে। কিন্তু এর কার্যকর প্রয়োগ খুবই দুর্বল। ২০২০ সালে ঢাবির আইন বিভাগের অধ্যাপক তসলিমা ইয়াসমিনের নেতৃত্বে পরিচালিত অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের এক গবেষণায় দেখা যায়, আইনটি সম্পর্কে ভুক্তভোগী, স্থানীয় প্রশাসন এমনকি অনেক এনজিওকর্মীরও সচেতনতা নেই। অধিকাংশ নারীই আইনটির নাম শোনেননি।
অপর এক বড় বাধা হলো আশ্রয়কেন্দ্র ও পুনর্বাসনের অভাব। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যমতে, বাংলাদেশে মাত্র ১৩টি সরকারি দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয়কেন্দ্র এবং কিছু স্বল্পমেয়াদি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার আছে। কয়েকটি এনজিওর আশ্রয়কেন্দ্র মিলিয়েও মোট সংখ্যা ৩৬-এর বেশি নয়। অথচ দেশে প্রায় ৮ কোটি নারী ও ৬ কোটি শিশু রয়েছে।
শাহীন আনাম বলেন, “আমি এক নারীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম কেন মামলা করলেন না। তিনি বললেন, ‘স্বামীকে গ্রেপ্তার করলে সন্তানদের খাওয়াবো কী দিয়ে?’” অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা ভুক্তভোগীদের আইনি পথে না যেতে বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম মনে করেন, নারীদের নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায়ন জরুরি। “সমাজকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নারীর প্রতি সহিংসতার কোনো জায়গা থাকবে না,” বলেন তিনি।
সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত গৃহহিংসার প্রতিফলন। আইন থাকলেও তার প্রয়োগ দুর্বল, আশ্রয়কেন্দ্র ও পুনর্বাসন সেবা অপর্যাপ্ত। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।


