আলেকজান্ডারের মৃত্যু – স্টিক্স বিষের সঙ্গে কি সম্পর্কিত?

খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ সালের জুন মাস, ব্যাবিলনের রাজা দ্বিতীয় নেবুচাদনেজারের রাজপ্রাসাদ। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট মাত্র ৩২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর ১৩ দিন আগে তিনি এক ভোজসভায় হঠাৎ তীব্র পেট ব্যথা এবং জ্বরে আক্রান্ত হন। এরপর তার শারীরিক অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকে, দুর্বলতা, তৃষ্ণা, খিঁচুনি, ব্যথা এবং আংশিক পক্ষাঘাতে ভুগতে শুরু করেন। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে তিনি আংশিক সংজ্ঞাহীন অবস্থায় চলে যান এবং কথা বলার বা নড়াচড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেন।

আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর ছয় দিন পর্যন্ত তার শরীরে পচন ধরেনি। প্রাচীন গ্রিকদের কাছে এটি ছিল ঐশ্বরিক শক্তির লক্ষণ। কিন্তু বাকি সবার কাছে দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে তার মৃত্যুর কারণ এবং তার শরীরের সংরক্ষণ একটি রহস্য হয়ে ছিল। নানা রকম তত্ত্ব এবং অনুমান সত্ত্বেও আলেকজান্ডারের মৃত্যু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত মামলাগুলোর মধ্যে অন্যতম।

প্রাচীনকাল থেকেই তার মৃত্যু নিয়ে বিতর্ক ছিল। কেউ কেউ প্রাকৃতিক অসুস্থতাকে দায়ী করতেন, কিন্তু প্লিনি থেকে ভলতেয়ার পর্যন্ত অনেক ঐতিহাসিকই মনে করতেন এর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র ছিল। ডিওডোরাসের মতে, “আলেকজান্ডারের উত্তরসূরিদের ক্ষমতার কারণে এই হত্যা-ষড়যন্ত্রটি ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল।” যারা বিষ প্রয়োগের সন্দেহ করতেন, তারা এমনকি বিষের ধরনও দাবি করতেন। রোমান পণ্ডিত পাউসানিয়াস “স্টিক্স নদী”-এর “মারণ ক্ষমতা” সম্পর্কে লিখেছিলেন এবং বলেছিলেন “স্টিক্সের জলই আলেকজান্ডারকে হত্যা করেছিল।” আলেকজান্ডারের একজন জীবনীকার প্লুতার্ক আরও এক ধাপ এগিয়ে দাবি করেন তার প্রাক্তন শিক্ষক দার্শনিক অ্যারিস্টটল, এই প্রাণঘাতী মাত্রাটি সরবরাহ করেছিলেন। বলা হয় অ্যারিস্টটল আলেকজান্ডারের নতুন রূপ দেখে ভীত হয়েছিলেন। তবে বাস্তবে এটি সম্পূর্ণ ভুল, কারণ আলেকজান্ডারের মৃত্যুর সময় অ্যারিস্টটল এথেন্সে ছিলেন।

এখানেই ইতিহাস পুরাণের সাথে মিলে যায়। আধুনিক বিশ্বে স্টিক্স নদী পরিচিত পাতালপুরীর কিংবদন্তী থেকে। প্রাচীন পুরাণ অনুযায়ী মৃতদের আত্মাকে হেডিস-এ যাওয়ার পথে এই নদী পার হতে হয়। কিন্তু স্টিক্স শুধু একটি পৌরাণিক প্রবেশপথ ছিল না, এটি একটি বাস্তব স্থানও ছিল। প্রাচীন দলিল এবং আধুনিক তদন্তের ভিত্তিতে, স্টিক্স-কে কার্যাথিস নদীর একটি উপনদী ম্যাভরোনেরি (কালো জল) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে যা করিন্থিয়ান উপসাগরে গিয়ে পড়েছে।

তাহলে মানুষ কেন মনে করত স্টিক্সের জল বিষাক্ত এবং এই বিষ দিয়ে আলেকজান্ডারকে হত্যা করা হয়েছিল? এই রহস্য উন্মোচনের জন্য স্ট্যানফোর্ডের ধ্রুপদী সাহিত্য ও বিজ্ঞানের ইতিহাস বিভাগের গবেষক অ্যাড্রিয়েন মেয়র একটি নতুন গবেষণামূলক নিবন্ধ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন প্রাচীনকালে অনেকেই স্টিক্সের বিষাক্ত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানত। প্লেটো এই নদীর “ভয়ংকর ক্ষমতা”র কথা উল্লেখ করেছেন, ভূগোলবিদ স্ট্রাবো এটিকে “মারাত্মক জল” বলেছেন এবং প্রাকৃতিক ইতিহাসবিদ প্লিনি বলেছেন এর জল পান করলে “তাৎক্ষণিক মৃত্যু” হয়। এমনকি মনে করা হত যে স্টিক্সের জল ধাতু এবং মাটির পাত্রগুলোও নষ্ট করে দেয়। ১৮৬০-এর দশকে বিখ্যাত জার্মান প্রকৃতিবিদ আলেকজান্ডার ভন হামবোল্টও বলেন স্থানীয়দের কাছে এই স্রোতটির একটি খারাপ খ্যাতি ছিল। বিংশ শতাব্দীতেও স্থানীয়রা এই স্রোতের জল পান করা এড়িয়ে চলত।

একজন প্রাচীন বিজ্ঞান-ইতিহাসবিদ অ্যাড্রিয়েন মেয়র স্টিক্সের জলের পৌরাণিক কাহিনী কীভাবে তৈরি হয়েছিল তা বুঝতে চেয়েছিলেন। তিনি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক-কে বলেন এই প্রকল্পটি বছরের পর বছর ধরে চলছে। প্রাচীন কিংবদন্তীর মধ্যে নিহিত প্রকৃত প্রাকৃতিক জ্ঞানগুলো উন্মোচন করা তার কাজের বিশেষত্ব। মেয়রের অনুসন্ধানে ভূতত্ত্ববিদ, রসায়নবিদ, বিষবিদ্যা বিশেষজ্ঞ এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীদের সহায়তা ছিল। তার গবেষণাপত্র এবং আসন্ন বই “মিথোপেডিয়া: প্রাকৃতিক ইতিহাসের কিংবদন্তীর একটি সংক্ষিপ্ত সংকলন”-এ তিনি যুক্তি দেন স্টিক্সের চুনাপাথর-আস্তৃত জলাশয়গুলো দুটি অত্যন্ত মারাত্মক প্রাকৃতিক পদার্থের জন্য আদর্শ বলে সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে, একটি ক্যালাইচিয়ামাইসিন এবং বিষাক্ত লাইকেন।

ক্যালাইচিয়ামাইসিন হলো চুনাপাথর থেকে তৈরি এক ধরনের শক্ত জমাট বাঁধা পদার্থ, বিশেষ করে যেখানে জল ফোঁটায় ফোঁটায় পড়ে এবং বাষ্পীভবন হয়। মেয়রের নিবন্ধে বলা হয়েছে, “এই ধরনের পরিবেশই প্রাচীন পর্যবেক্ষকরা স্টিক্স/ম্যাভরোনেরি জলপ্রপাতের পাথুরে জলাশয়ের বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন।” চুনাপাথরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত জল ক্যালসিয়াম কার্বনেটের সাথে মেশে পাথর, শ্যাওলা এবং লাইকেন-এর উপর শক্ত ক্যালাইচ ক্রাস্ট তৈরি করে। এটি ধাতু বা মাটির উপরও জমা হতে পারে, যা পাত্র ক্ষয় হওয়ার পৌরাণিক কাহিনীকে ব্যাখ্যা করে।

বিভিন্ন জীব এই ক্যালাইচ-এর উপরিভাগে জন্মায়। এর মধ্যে কিছু, যেমন সায়ানোব্যাকটেরিয়া, মানুষের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। ১৯৮০-এর দশকে একজন বিষবিদ্যা বিশেষজ্ঞ টেক্সাসে ক্যালাইচ-এর একটি নমুনা সংগ্রহ করেন, যা ক্যালাইচিয়ামাইসিন-এর আবিষ্কারের দিকে নিয়ে যায়। এটি শক্তিশালী কেমোথেরাপির জন্য ব্যবহৃত একটি বিষাক্ত পদার্থ, কিন্তু এর মূল রূপে এটি রাইসিন-এর চেয়েও বেশি মারাত্মক। এটি আলেকজান্ডারের মৃত্যুর কারণ কিনা তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না, কারণ এটি উৎপাদিত হওয়ার জন্য প্রাচীনকালে সঠিক পুষ্টি এবং মাটির অবস্থার উপস্থিতি প্রয়োজন। তবে এই বিষের মাত্রার উপর ভিত্তি করে এর কারণে মৃত্যু হতে দিন বা সপ্তাহ লাগতে পারে, যা ডিএনএ ধ্বংসের মাধ্যমে বহু-অঙ্গ ব্যর্থতা ঘটায়। যেহেতু এটি অ্যালকোহলে মিশে যায়, তাই এটি আলেকজান্ডারের ভোজসভার পানীয়ের সাথে মিশিয়ে দেওয়ার জন্য একটি নিখুঁত বিষ হতে পারে।

মেয়র দ্বিতীয় একটি মাটি-ভিত্তিক বিষের কথা বলেছেন, যা স্টিক্সের চুনাপাথর শিলা ও জলাশয়গুলো থেকে সংগ্রহ করা হতে পারত। অনেক ছত্রাক, ছাঁচ এবং লাইকেন বিষাক্ত মাইকোটক্সিন তৈরি করে। মেয়রের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, “প্রতি আটটি লাইকেন প্রজাতির মধ্যে একটিতে মাইক্রোসিস্টিনস নামক বিষ থাকে, এটি যকৃতের ক্ষতি ঘটায়।” প্রাচীন লোকেরা লাইকেন-কে আশ্রয়দাতা গাছ এবং পাথর থেকে আলাদা মনে করত না, তাই তারা এর বিষক্রিয়ার উৎসকে চিহ্নিত করতে পারেনি। পাউসানিয়াস যেমন বলেছিলেন স্টিক্স নদীর কাছে ছাগল মারা যেত। এই অঞ্চলে চুনাপাথরের উপর যে লাইকেন-সৃষ্টিকারী ছত্রাক জন্মায়, তা কালো রঙের হয়। এই ছত্রাকগুলো ক্ষয়কারী অক্সালিক অ্যাসিডও নিঃসরণ করে। এটিও সেই গুজবের ব্যাখ্যা দেয় যে স্টিক্সের জল ধাতুকে নষ্ট করে দেয়।

মেয়র বলেন, “এই পদার্থগুলো গ্রহণ করার ফল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর ধরে পর্যবেক্ষণ এবং স্মরণ করা হয়েছে।” এমনকি যদি শুধুমাত্র কয়েকটি প্রাণী এবং মানুষ মারাও যেত, সেই ঘটনাগুলোর স্মৃতি একটি নদীর চারপাশে পুরাণ তৈরি করার জন্য যথেষ্ট ছিল, যা ইতিমধ্যেই পাতালপুরীর গল্পের সাথে জড়িত ছিল।

মেয়র জোর দিয়ে বলেন যে, তার গবেষণাটি আলেকজান্ডারের মৃত্যুর বিতর্কের সমাধান করে না। এর জন্য আমাদের হয় একটি টাইম মেশিন নতুবা একটি বিষবিদ্যা-ভিত্তিক ময়নাতদন্তের প্রয়োজন। কিন্তু তার গবেষণাটি এটি ব্যাখ্যা করে কেন মানুষ মনে করত আলেকজান্ডার স্টিক্সের জল পান করেছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন