চীনা সরকারের টার্গেট: একজন বন্ধু, একজন সাক্ষী
এইচ, একজন চীন-জন্মগ্রহণকারী সিঙ্গাপুরীয় নাগরিক, ছিলেন একজন সফল উদ্যোক্তা। কিন্তু ২০২০ সালে তাঁর বিরুদ্ধে চীনের পুলিশের তরফে অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়, যা অনুসরণ করে ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে ‘রেড নোটিশ’ জারি করা হয়। এরপর তাঁর পাসপোর্ট জব্দ করে ফরাসি কর্তৃপক্ষ, এবং তাঁকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়।
কিন্তু পুরো ঘটনার মোড় ঘুরে যায় ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে, যখন জ্যাক মা নিজে এইচ-কে ফোন করেন। তিনি বলেন, “তারা বলেছে, তোমাকে ফিরিয়ে আনতে আমিই পারি।” এইচ ফোনটি রেকর্ড করেছিলেন, এবং আদালতে তা প্রমাণ হিসেবে পেশ করেন। এর আগেও তিনি চীনা নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের এবং বন্ধুদের ফোন রেকর্ড করেছিলেন যারা তাঁকে ফিরে যেতে বলেছিলেন।
উদ্দেশ্য: পতিত নেতা সান লিজুনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য
চীনা সরকারের উদ্দেশ্য ছিল এইচ-কে দেশে ফিরিয়ে এনে এক সময়ের ক্ষমতাধর চীনা নিরাপত্তা কর্মকর্তা সান লিজুনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা। সান লিজুনকে দুর্নীতি, ঘুষ গ্রহণ ও শেয়ারবাজারে হস্তক্ষেপের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। সান পূর্বে হংকংয়ের নিরাপত্তা দায়িত্বে ছিলেন এবং বেইজিংয়ের গণতন্ত্রবিরোধী অবস্থানের বিরুদ্ধে হওয়া বিক্ষোভ দমনেও ভূমিকা রেখেছিলেন।
জ্যাক মা এইচ-কে ফোনে বলেন, “তোমার সমস্যাগুলো আসলে সান-এর জন্য। তারা চায় তুমি সাক্ষ্য দাও। তুমি ফিরে গেলে সব মিটে যাবে।” কিন্তু ফোনালাপে মা নিজেই অসন্তুষ্ট ছিলেন এ ঘটনায় তাঁকে টেনে আনার জন্য। তিনি প্রশ্ন করেন, “তুমি কেন আমায় এতে জড়ালে?”
জ্যাক মার চাপের পেছনে
জ্যাক মা নিজেও ২০২০ সালে একটি বক্তৃতায় চীনের আর্থিক নিয়ন্ত্রকদের সমালোচনা করে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির রোষানলে পড়েন। তাঁর কোম্পানি অ্যান্ট গ্রুপের আইপিও বাতিল করা হয় এবং ২.৮ বিলিয়ন ডলারের জরিমানা করা হয়। এরপর তিনি বহু মাস লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান।
ফোনালাপে মা বলেন, “তারা খুব কঠিনভাবে আমার সঙ্গে কথা বলেছে। বলেছে তুমি ফিরে এলে শাস্তি মাফ করা হতে পারে। অন্য কোনো পথ নেই, দড়ি টানটান হতে থাকবে।”
মানসিক যন্ত্রণা ও আইনি লড়াই
এইচ ও তাঁর আইনজীবীরা জানতেন যে চীনে ফেরত গেলে তাঁকে আটক, নির্যাতন ও জোর করে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হবে। তাঁর ব্যবসার শেয়ার অন্যদের হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে। চীনের বিচারব্যবস্থায় দণ্ডদানের হার ৯৯.৯৮ শতাংশ, যেখানে জোরপূর্বক গুম ও নির্যাতন স্বাভাবিক ঘটনা।
এইচ-এর বিরুদ্ধে আনীত অর্থ পাচারের অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল Tuandai.com নামক একটি ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, যার প্রতিষ্ঠাতা ২০ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত। এইচ বিনিয়োগকারী ছিলেন, এবং চীনা পুলিশ সন্দেহ করেছিল তিনি কিছু তহবিল বিদেশে স্থানান্তর করেছিলেন। তবে তাঁর আইনজীবীরা দাবি করেন, তিনি জানতেন না যে অর্থের উৎস অনৈতিক ছিল।
রেড নোটিশের ব্যবহার
এইচ-এর ওপর ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি করা হয়, যা তাঁকে বিশ্বজুড়ে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে। এর ফলে তিনি কোথাও ভ্রমণ করতে পারছিলেন না। টেড ব্রোমুন্ড, একজন বিশেষজ্ঞ সাক্ষী, একে বলেন “প্রজাপতির গায়ে পিন লাগিয়ে দেওয়া”— একধরনের স্থবিরতা চাপিয়ে দেওয়া হয়।
বিশ্বের বহু স্বৈরশাসক দেশ রেড নোটিশ ব্যবস্থার অপব্যবহার করে। রিস ডেভিস নামক এক ব্রিটিশ আইনজীবী এটিকে বলেন “স্বৈরাচারদের স্নাইপার রাইফেল— দূর থেকে, লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকর।” তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনের কৌশল ভিন্ন। তারা অধিকাংশ সময় আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণের পথে না গিয়ে পরিবারকে ভয় দেখিয়ে ও হুমকি দিয়ে ব্যক্তিকে “স্বেচ্ছায়” ফেরার জন্য চাপ দেয়।
বিচার ও পুনর্বাসন
২০২১ সালের জুলাইয়ে ফ্রান্সের বোর্দো আপিল আদালত চীনের প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে এবং পরে ইন্টারপোল ‘রেড নোটিশ’ বাতিল করে। আদালতে প্রমাণিত হয়, এ অনুরোধ ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অবশেষে, সান লিজুনকে এইচ-এর সাক্ষ্য ছাড়াই মৃত্যুদণ্ডের স্থগিত রায় দেওয়া হয়। অন্যদিকে এইচ চীনে ব্যবসা করতে না পেরে প্রচণ্ড ঋণে জর্জরিত হন, এবং ১৩৫ মিলিয়ন ডলারের দেনায় পড়েন। গার্ডিয়ানের অনুরোধেও তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জ্যাক মা’র ফিরে আসা
জ্যাক মা-কে পরে দেখা যায় চীনের নেতাদের সঙ্গে প্রকাশ্যে হাসিমুখে হাততালি দিতে, যা তাঁর “পুনর্বাসনের” ইঙ্গিত বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। এইচ-এর আইনজীবী ক্লারা জেরার্দ-রদ্রিগেজ বলেন, “যে মানুষটিকে বিশ্বব্যাপী অপ্রতিরোধ্য মনে করা হতো, তিনি পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেলেন, পরে ফিরে এলেন পার্টির প্রতি আনুগত্য দেখাতে। এইচ-এর ক্ষেত্রেও একইটি প্রত্যাশা করা হয়েছিল।”


