আমের অর্থনীতি

বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু আম উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি হলেও এই খাতে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সামান্যই ব্যবহার করতে পেরেছে। বছরে ২০ লাখ টনের বেশি আম উৎপাদন হলেও এটি এখনো কেবল একটি মৌসুমি ভোগ্যপণ্য হিসেবেই বিবেচিত, কোনো কৌশলগত শিল্প হিসেবে নয়। দেশে আমের প্রক্রিয়াজাতকরণ খুবই কম, রপ্তানি সীমিত, এবং অবকাঠামোও দুর্বল।

কৃষি তথ্য সার্ভিসের মতে, বাংলাদেশে ফলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন ও খাওয়া হয় আম। আম পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ও এর বহুমুখী ব্যবহার করা যায়। বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলে আম হয়। এর অপূর্ব ঘ্রাণ, মিষ্টি স্বাদ এবং পুষ্টিমূল্য একে দিয়েছে “ফলের রাজা”র মর্যাদা।

তবুও, এর জনপ্রিয়তা ও বিস্তৃত চাষাবাদের পরও, আমকে এখনো একটি প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পপণ্য হিসেবে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।যদিও চাষি, নার্সারি মালিক এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীরা আম ব্যবসায় বেশ লাভ করেন। কিন্তু আমকে কেন্দ্র করে কৃষিভিত্তিক শিল্প সেভাবে এখনো দাঁড়ায়নি।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এটি একটি বড় সুযোগ হারানোর শামিল। বিদেশি ফলের রস, জ্যাম ও জেলি আমদানির প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায়, বাংলাদেশের নিজস্ব আমভিত্তিক মূল্য সংযোজন শিল্প গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাবনা দুটোই রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিক্রি সীমিত থাকলেও, আমদানি বিকল্প হিসেবে দেশেই আমজাত পণ্যের উৎপাদন বাড়ালে অনেক অর্থ দেশেই থেকে যাবে। আর আমভিত্তিক রপ্তানিমুখী শিল্প করা গেলে কর্মসংস্থান, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারে।

১৯৮৫ সাল থেকে সরকার আম উৎপাদন বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এখনো জাতীয় শিল্প কৌশলে আমের স্থান নেই এবং একে কৌশলগত কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।

বর্তমানে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় “রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প” অনুসারে বাংলাদেশে প্রায় ১,২০,০০০ একর জমিতে আম চাষ হচ্ছে। যার প্রধান অঞ্চলগুলো হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম।

আমের অর্থনৈতিক গুরুত্ব এর কর্মসংস্থানের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। কেবল চাঁপাইনবাবগঞ্জেই প্রতি ১০ একর বাগানে এক মাসের জন্য ৬ থেকে ৭ জন শ্রমিক কাজ করে। আমের মৌসুমে প্রায় ৮০,০০০ মানুষের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি হয়।

বিশ্বজুড়ে, ফিলিপাইন ও ভারতের মতো দেশগুলোতে আম অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফিলিপাইন সারা বছর চাষ অব্যাহত রাখতে বিশেষ কৌশল ব্যবহার করে, আর ভারত আমকে একটি রপ্তানিকেন্দ্রিক কৃষিপণ্য শিল্প হিসেবে সফলভাবে গড়ে তুলেছে।

রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মো. আরিফুর রহমানের মতে, বাংলাদেশ বছরে ২৪ থেকে ২৫ লাখ টন আম উৎপাদন করে, যার অভ্যন্তরীণ বাজার মূল্য প্রায় ১৩,০০০ থেকে ১৪,০০০ কোটি টাকা। অনেকে আম খাতের প্রকৃত মূল্য ৩০,০০০–৩৫,০০০ কোটি টাকা হিসেবে ধারণা করেন, যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বেশি।

তবে রপ্তানির ক্ষেত্রে এখনো অনেক বাধা রয়ে গেছে। বাংলাদেশি আমের স্বাদ তুলনাহীন হলেও, অল্প সংরক্ষণক্ষমতা এবং চেহারার অমসৃণতা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে। “স্বাদ অতুলনীয়, কিন্তু রঙ ও দ্রুত পচে যাওয়ার কারণে রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়,” বলেন আরিফুর রহমান।

এইসব বাধা সত্ত্বেও, গত পাঁচ বছরে দেশে আম উৎপাদন গড়ে ১০ শতাংশ হারে বেড়েছে। দেশজুড়ে প্রতি মৌসুমে প্রায় ৮০,০০০ মানুষ আম অর্থনীতিতে যুক্ত হয়—শ্রমিক থেকে শুরু করে ই-কমার্স কর্মী, কুরিয়ার, প্রক্রিয়াজাতকরণকর্মী পর্যন্ত।

বর্তমানে বাংলাদেশে ৭২টি জাতের আম উৎপাদিত হচ্ছে এবং ৩৮টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। ভালো মানের সংরক্ষণ ও কোয়ারানটাইন অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে আম রপ্তানি অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকার খাত হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।

এদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামে আম বিপ্লব জীবন বদলে দিচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে স্বনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব অঞ্চলটি এখন দেশের একটি ফলের ঝুড়িতে পরিণত হচ্ছে, যা জাতীয় ফল উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশের জোগান দিচ্ছে।

বর্তমানে খাগড়াছড়ির প্রায় ৩,৫০০ আমচাষি বছরে ৬০,০০০ টন আম উৎপাদন করছে, যার বাজার মূল্য প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ।উৎপাদন প্রতি বছর অন্তত ১০ শতাংশ হারে বাড়ায় এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তর ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক এম এ সাত্তার মণ্ডল ডেইলি স্টারকে বলেন, “প্রতিযোগিতামূলক আম অর্থনীতি গড়ে তুলতে আমাদের গবেষণা ও উন্নয়ন বাড়াতে হবে, চাষি ও রপ্তানিকারকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ দিতে হবে এবং বিশেষ আমকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে যেখানে থাকবে আধুনিক হিমাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট ও পরিবহন নেটওয়ার্ক।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন