আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হয়েই ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, প্যারিস জলবায়ু চুক্তির (২০১৫) অধীনে আমেরিকা আর থাকবে না। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাসের ক্ষতিকর প্রভাব ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা। পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পবিপ্লব যুগের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়তে না দেওয়া এবং সম্ভব হলে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চেষ্টা করা।
২০১৬ এবং ২০২৪-র নির্বাচনি প্রচারে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন যে, আমেরিকার ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিকে চাঙা করতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারকে তার প্রশাসন পূর্ণ সমর্থন করবে এবং প্যারিস চুক্তি থেকে আমেরিকা নিজেকে সরিয়ে নেবে। কারণ প্যারিস চুক্তিতে থাকতে হলে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে হবে এবং অনুন্নত দেশগুলোকে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডে অনুদান দিয়ে বাধ্যতামূলকভাবে সাহায্য করতে হবে। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আমেরিকার ফসিল ফুয়েল ইন্ডাস্ট্রির যোগাযোগ অস্বীকার করা যায় না। আমেরিকার রাজনীতিতে এই ইন্ডাস্ট্রি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এমনকি এই শিল্পের মালিকরা মনে করেন, পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির পিছনে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের কোনও ভূমিকা নেই!
প্রসঙ্গত, গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনে পৃথিবীতে প্রথম স্থানে আছে চীন (৩১.৯ শতাংশ), দ্বিতীয় স্থানে আমেরিকা (১৩ শতাংশ) আর তৃতীয় স্থানে ভারত (৮.১ শতাংশ)। ট্রাম্প মনে করেন, প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে চীন ও ভারতের ওপর জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমেরিকার মতো বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে না! প্যারিস জলবায়ু চুক্তিকে মান্যতা দিয়ে ওবামা এবং বাইডেন প্রশাসন জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহারকে জোরদার করতে চেয়েছিল। যার ফলে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি, ব্যাটারি-চালিত গাড়ি উৎপাদনে জোর দেওয়া হয়েছিল। পদক্ষেপ করা হয়েছিল বিকল্প শক্তি উৎপাদনের মধ্যে দিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার। আমেরিকার অর্থনীতিকে কার্বনমুক্ত করার চেষ্টা চলছিল।
কিন্তু ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি আমেরিকার ফসিল ফুয়েলনির্ভর অর্থনীতির ক্ষতি করবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে আমেরিকানদের বঞ্চিত করবে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে আমেরিকার বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত বিশ্বের ভূ-রাজনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একটি প্রশ্ন উঠে এসেছে, চীনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই প্যারিস চুক্তি থেকে আমেরিকা সরে আসেনি তো? তবে এই পরিপ্রেক্ষিতে চীন, ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। চীন এবং ভারতের ওপর চাপ আসবে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার।
পৃথিবীর সব দেশের সক্রিয় সহযোগিতা না পেলে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি নিরর্থক হবে। তবে খাস আমেরিকায় ব্যাটারি-চালিত গাড়ি এবং বিকল্প জ্বালানি শিল্পের উৎপাদন যেভাবে এগিয়ে চলেছে, সে ক্ষেত্রে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা আগামীতে ক্রমশ হ্রাস পাবে।তাই অদূর ভবিষ্যতে আমেরিকা যদি আবার প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে যোগ দেয়, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।


