“আমি আমার নিজস্ব ভাষা খুঁজে পেতে চাই” : চৈতন্য তামহানে, ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক

প্রশ্ন: একজন পরিচালক এবং চিত্রনাট্যকার হিসেবে আপনার কাছে সিনেমার সবচেয়ে সুন্দর দিক কী?

চৈতন্য: আমার কাছে সিনেমার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো মানুষের অনুভবকে পর্দায় তুলে ধরা। এমন মানুষদের জন্য সহানুভূতি সৃষ্টি করা যারা সমাজের চোখে ভুল বা অযোগ্য। সিনেমা এক ধরনের ক্যাথারসিস বা আত্মশুদ্ধি একটা নিরাপদ জায়গায় বসে নিজের ভেতরের জটিলতাগুলো অনুভব করা, যেন চোখ খোলা রেখে স্বপ্ন দেখা। এটা সিনেমার একদম নিজস্ব গুণ, বিভিন্ন শিল্প একত্র হয়ে এমন কিছু সৃষ্টি করে যা আমাদের ভেতরের মানুষটাকে স্পর্শ করে। এই জিনিসটাই এখন আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে।

প্রশ্ন: আর সিনেমা বানানোর সবচেয়ে সুন্দর দিকটা কী?

চৈতন্য: সিনেমা বানানোতে কষ্ট বেশি, ঝামেলা বেশি। তবুও যদি বলতে হয় সবচেয়ে সুন্দর দিক কী, তাহলে বলব অনেক মানুষ একসাথে একটাই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে, সেটা! এক ধরণের অনিশ্চয়তা, জীবন্ত অনুভব, নিজেকে হারিয়ে ফেলার অভিজ্ঞতা, সময় বা অহং কিছুই মাথায় থাকে না। কিছুই নেই, শুধু একটা কিছু সৃষ্টি করার জন্য সবাই মিলে পরিশ্রম করছে। সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তটা হলো যখন কোনো দৃশ্য এমনভাবে হয়ে যায় যা প্ল্যানে ছিল না, বা যা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক ভালো হয়। এই ক্ষণিক বিস্ময় আর ছোট ছোট মিরাকল-এর মুহূর্তগুলোই ফিল্মমেকিং এর সবচেয়ে সুন্দর দিক আমার কাছে।

প্রশ্ন: ভারতে তো সবাই যেন সিনেমার ভেতরেই জন্মায়। আপনার গল্প কেমন ছিল?

চৈতন্য: হ্যাঁ, ভারতে সিনেমা আর ক্রিকেট হলো ধর্মের মতো। তাই আমিও কখনও সিনেমা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম না।
ছোটবেলায় আমার মা ক্যাসেটে গল্প শোনাতেন, আমি বই পড়তাম, পত্রিকা পড়তাম। তবে বলতে হবে আমি কোনো ‘সংস্কৃতিমনস্ক’ পরিবারে বড় হইনি। আমরা খুব সাধারণ পরিবার ছিলাম। আমাদের জন্য সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখা ছিল বিলাসিতা।
আমার বাবা স্থানীয় থিয়েটারের এক বন্ধুর মাধ্যমে বিনামূল্যে নাটক দেখতে নিয়ে যেতেন। তাইআমি থিয়েটারের কাছেই বড় হয়েছি। তখন আমি অভিনেতা হতে চাইতাম!

প্রশ্ন: সিনেমার প্রতি ভালোবাসা কীভাবে জন্মাল?

চৈতন্য: আমি বরাবরই সিনেমার ভক্ত ছিলাম, কিন্তু বলিউডের বাইরের সিনেমা আমাকে বেশি টানত। অনেক কিছু বুঝতাম না, তবু এক ধরণের মুগ্ধতা কাজ করত। একজন থিয়েটার ডিরেক্টর আমাকে City of God নামে একটা সিনেমা দেখতে বলেছিলেন। আমি তখন ভিডিও লাইব্রেরি থেকে ভাড়া নিয়ে সেটা দেখি, আর সেটা আমার জীবনে বড় একটা মোড় এনে দেয়। তখনই আমি বুঝতে পারি, শুধু বলিউড-হলিউড নয়, পৃথিবীর অনেক জায়গায় দারুণ সিনেমা তৈরি হচ্ছে। এরপর আমি শুধু সিনেমা দেখতাম, যেন আমার আর কোনো পরিচয়ই ছিল না!

প্রশ্ন: মাত্র ১৭ বছর বয়সেই আপনি টেলিভিশনের জন্য লেখালেখি শুরু করেন?

চৈতন্য: হ্যাঁ, আমি এক থিয়েটার ডিরেক্টরের সঙ্গে কাজ করছিলাম, যিনি তখন টিভির জন্যও লিখতেন। উনি একদিন বললেন, “তুমি খুব ইন্টারেস্টিং ভাবে কথা বলো, তোমার আইডিয়াও আছে, এসো আমার সঙ্গে লেখো।” টাকা খুব বেশি ছিল না, মাসে তিনশো ডলার মতো।কিন্তু আমার জন্য সেটা অনেক কিছু ছিল। পরে কিছু খারাপ অভিজ্ঞতা হয়, টেলিভিশন ছেড়ে দিই। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন আমি ভারতীয় সিনেমায় চুরি বা প্ল্যাজারিজম নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি বানাই। এটা আমার বলিউড থেকে বিদায়পত্র ছিল। সৌভাগ্যবশত কয়েকজন মেন্টরের সঙ্গে দেখা হয়, যারা ভিন্নধর্মী সিনেমা ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন।

প্রশ্ন: এরপর তো আপনি ‘Court’ বানান, সেটা ভেনিস ফেস্টিভালে নির্বাচিত হয় এবং ভারত থেকে অস্কারের জন্যও পাঠানো হয়।

চৈতন্য: হ্যাঁ, আমার সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত ছিল যখন ভেনিস ফেস্টিভালে ‘Court’ নির্বাচিত হয়। এর আগে পৃথিবীর সব বড় বড় ফেস্টিভাল এই সিনেমা ফিরিয়ে দিয়েছিল। একমাত্র একটা সেলস এজেন্ট এবং ভেনিস ছিল আমাদের আশার আলো। আমি কোনো পুরস্কার বা রিভিউ চাইনি, শুধু চেয়েছিলাম ছবিটা যেন কোথাও জায়গা পায়। ‘Court’ আন্তর্জাতিক দর্শকের জন্য বানানো হয়নি। এতে কাস্ট, শ্রেণী, স্থানীয় রাজনীতি কিংবা সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কোনো সহজীকরণ ছিল না। কোনো আপস করিনি।

প্রশ্ন: আপনি যেই পথে হেঁটেছেন, সেটা বলিউডের বিপরীতধর্মী।

চৈতন্য: (হাসি) হ্যাঁ, ছোটবেলা থেকেই আমার মধ্যে একটা অস্থিরতা ছিল। আমার আশেপাশে যেসব সিনেমা দেখতাম, সেসবে আমি সন্তুষ্ট ছিলাম না। ভারতে সবাইকে শ্রদ্ধা করতে শেখানো হয়, প্রশ্ন তুলতে নিরুৎসাহিত করা হয়। আমি এই অতিরিক্ত শ্রদ্ধার ধারণাটাতেও বিরক্ত ছিলাম। আমি চাইনি শতবর্ষের ঐতিহ্যের ভারে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে। আমি চেয়েছিলাম আমার নিজের ভাষা, আমার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজে পেতে।

প্রশ্ন: এমন কারা ছিলেন যাঁদের সাহায্যে আপনি এ যাত্রা সম্ভব করতে পেরেছেন?

চৈতন্য: দুজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ আছেন। একজন হচ্ছেন আমার প্রযোজক বিবেক গোম্বার। আমি থিয়েটারে ওকে পরিচালনা করেছিলাম, তখন থেকেই বন্ধুত্ব। একসময় আমি একদম ভেঙে পড়ি, ফিল্ম মেকিং তো দূরের কথা, জীবনই ছেড়ে দিতে চাচ্ছিলাম।
বিবেক আমাকে শর্তহীনভাবে টাকাটা দিলেন “এই নাও এক বছরের সময়, বসে লেখো।” তারপর থেকে সে আমার প্রায় দ্বিতীয় পিতার মতোই জীবনের একটা অংশ। আরেকজন হচ্ছেন আলফনসো কুয়ারোন।

প্রশ্ন: তিনি তো ‘The Disciple’-এর এক্সিকিউটিভ প্রযোজকও ছিলেন।

চৈতন্য: ‘Court’-এর পর আমাকে Rolex Mentor and Protégé Arts Initiative-এর জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়, আর মেন্টর ছিলেন Alfonso Cuarón! আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। আমরা লন্ডনে দেখা করি, আর দারুণভাবে মিলে যাই। উনি ‘Court’ দেখেছিলেন, সম্ভবত সেটাই তাকে প্রভাবিত করে। এরপর আমি নির্বাচিত হই! আমাকে ‘Roma’-র সেটে উনি তাঁর বন্ধু হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। আমি ছিলাম একমাত্র ব্যক্তি যিনি পুরো স্ক্রিপ্ট পড়েছিলেন এবং মনিটরে কাজ করতে পারতেন। এটাই ছিল আমার জন্য সবচেয়ে বড় সম্মান। আমি ভাবতাম আমি খুবই ডিটেইলে যাই। কিন্তু Alfonso-কে দেখে বুঝলাম, ও একজন যাদুকর! ওর প্রতিটি সিদ্ধান্ত আবেগ ও সাবকনশাসকে স্পর্শ করার জন্য। ‘The Disciple’-এর প্রতিটি শটে ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট আছে, কিন্তু কেউ বুঝতেই পারবে না, এটাই Alfonso’র প্রভাব। তিনি আমার ডিরেক্টর অফ ফটোগ্রাফিও ঠিক করে দেন। আমি নিজে দ্বিধায় ছিলাম, কিন্তু উনি বললেন বিশ্বাস রাখো। আমি রাখলাম। আজ বুঝি, তিনি ঠিকই ছিলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন