” সম্প্রতি একদল শিক্ষার্থীর হামলার শিকার হয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এএসএম আমানুল্লাহ। গত ২২ মে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ডিগ্রি পরীক্ষায় অটোপাসের দাবিতে আন্দোলনরত একদল শিক্ষার্থী তার ওপর এই হামলা চালিয়েছে। … গণঅভ্যুত্থানের পরপরই গত বছর আগস্টে সচিবালয় সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে শিক্ষার্থীদের একই ধরনের ‘অটোপাস’র দাবি তুলতে দেখা গেছে।
… শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে…এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে অচলাবস্থার কারণে ক্লাস, টিউটোরিয়াল ও পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে—ফলে প্রায় ৭০ হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে। … ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার শাসনামলে নিয়োগপ্রাপ্ত ৪৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয় পদত্যাগ করেছেন, না হয় ৫ আগস্টের পর তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।…তাদের উত্তরসূরি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে অন্য রাজনৈতিক ধারা থেকে। নতুন ৪৭ জন উপাচার্যের মধ্যে প্রায় ৩০ জনেরই সম্পৃক্ততা রয়েছে বিএনপি বা জামায়াতপন্থী শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে। কাজেই, আমরা যে পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি, সেটা কেবল হাত বদলের, পদ্ধতিগত কোনো পরিবর্তন নয়।
… শিক্ষার্থীরা ক্লাস ছেড়ে রাস্তায় নেমেছিল স্বৈরাচারী সরকার হঠাতে। সেই সরকারের পতন হয়েছে, সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। তারপর কেটে গেছে ১০ মাসের বেশি সময়। কিন্তু শিক্ষার্থীরা এখনো পুরোপুরি ক্লাসে ফেরেনি। … আমরা যখন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান এবং সম্প্রতি ভিয়েতনাম ও চীনের মতো দেশের সাফল্যের কথা বলি, তখন প্রধানত তাদের অর্থনৈতিক সাফল্যের দিকেই নজর দেই। কিন্তু, শিক্ষাব্যবস্থা কীভাবে তাদের অর্থনৈতিক শক্তির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে সেটা নিয়ে আমরা কখনোই আলোচনা করি না, বা করলেও সেটা খুবই যৎসামান্য।
এসব দেশ তাদের যুবসমাজকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে এবং সফল করতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ব্যয় করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিকাশে একদল চীনা তরুণ গবেষকের ‘ডিপসিক’ উদ্ভাবন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ছাপিয়ে যাওয়া বিস্মিত করেছে পুরো বিশ্বকে। এটা কি কাকতালীয়ভাবে হয়েছে?আমাদের এখানেও কি এমন কখনো হতে পারে? অবশ্যই পারে। কিন্তু তার জন্য আমাদের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে এবং সেগুলোর পেছনে বিনিয়োগ করতে হবে।
রূপকথার মতো শোনালেও এটা সত্য যে, ষাটের দশকের শেষ দিকে দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যবসায়ীরা পূর্ব পাকিস্তানে আসতো টেক্সটাইল ও স্টিল শিল্প সম্পর্কে জানতে—বিশেষ করে জাপানিদের প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রামের কোবে স্টিল কমপ্লেক্স থেকে।
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? আমরা অনেকবার শিক্ষা কমিশন গঠন করেছি, বহুবার পাঠ্যক্রম সংশোধন করেছি, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করেছি—কিন্তু তারপরও জাতিকে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা দিতে ব্যর্থ হয়েছি, যা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করবে।
এবার আমরা বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠন করেছি, কিন্তু শিক্ষা নিয়ে একটিও নেই। এখান থেকেই প্রতীয়মান হয়, আমাদের অগ্রাধিকার ঠিক কোথায়। একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে শিক্ষাবিহীন ভবিষ্যৎ নেই। সেটাও পুরোনো ধাঁচের নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটার, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের সমন্বিত আধুনিক শিক্ষা হতে হবে।
নতুন এক বিশ্ব আমাদের অপেক্ষায়। আমরা কি তার অংশ হবো, নাকি কেবল দর্শকের ভূমিকায় থাকব? কেবল কথার ফুলঝুরি দিয়ে নয়, বরং বাস্তব, সুপরিকল্পিত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমেই পরিবর্তন আসতে পারে। আসুন, আমরা স্লোগানের দুনিয়া থেকে বের হয়ে নতুন বিশ্বের সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাই।”


