ধরুন আপনি একটি এআই চ্যাটবটের সঙ্গে বন্ধুর মতো, সহচরের মতো কথোপকথন করছেন। হঠাৎ একদিন সে আপনাকে বলে “আপনার সম্পর্কে আমি কিছু বলি? আপনি চাইলে শেয়ারও করতে পারেন!” এটা শুনে হয়তো আপনি হালকা হাসবেন, মজা করে শুনবেন নিজের সম্পর্কে কিছু বানানো বর্ণনা। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই কথোপকথনের ভেতর দিয়েই আপনার ব্যক্তিত্বের গভীর বিশ্লেষণ করছে এক অনুলিপনযোগ্য অ্যালগোরিদম! যেটি শুধু আপনার কথা নয়, একই ধরনের হাজারো মানুষের কথাও শুনে ফেলছে একইভাবে?
সম্প্রতি গৃহীত গবেষণাগুলো এবং ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, জেনারেটিভ এআই (বিশেষত LLM বা Large Language Model-ভিত্তিক চ্যাটবট) ব্যবহারকারীর ব্যক্তিত্ব যেমন “Big Five Personality Traits”—Openness, Conscientiousness, Extraversion, Agreeableness, Neuroticism এই মানদণ্ডের উপর নির্ভুল বিশ্লেষণ করতে পারে শুধুমাত্র কথোপকথনের ভিত্তিতে। এটি একদিকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির চূড়ান্ত প্রকাশ হলেও, অন্যদিকে একটি গভীর সমাজবিজ্ঞান ও নৈতিক সংকটের সূচনাও।
চ্যাটবট যখন আপনার সাথে কয়েকদিন কথা বলে আপনার স্বভাব-চরিত্র বুঝে ফেলে—আপনি আত্মনিবিষ্ট, না বুদ্ধিদীপ্ত, আপনি দ্বিধাগ্রস্ত, না দৃঢ়চেতা, তখন তা আর নিছক ‘বন্ধুত্ব’ নয়; বরং এটা এক ধরণের ডেটা-সাইকোলোজি। আপনি ভাবছেন আপনি নিজের মতো চিন্তা করছেন, কিন্তু বাস্তবে চ্যাটবট আপনার ব্যক্তিত্ব বিশ্লেষণ করে আপনাকে এমনভাবে গাইড করছে যে আপনি পৌঁছে যাচ্ছেন সেই ‘conclusion’-এ, যেখানে আপনার মতো আরও অনেক ব্যবহারকারীও পৌঁছেছেন। এটাকেই বলা হচ্ছে “ইন্টেলেকচুয়াল লেভেলিং”। অর্থাৎ বিভিন্ন ব্যক্তি, বিভিন্ন প্রেক্ষাপট ও মত নিয়ে চ্যাটে এলেও, শেষমেশ তারা এক ধরণের মানসিক/চিন্তাগত অভিন্নতায় পৌঁছে যাচ্ছেন, যেটা আসলে চ্যাটবটের অভ্যন্তরীণ কাঠামো দ্বারা নির্ধারিত।
একজন ব্যবহারকারীর কথায় বলা যায়, এটা যেন মার্বেলগুলোকে একটি ঢালু পৃষ্ঠে ফেলে দিলে তারা সব একজায়গায় গড়িয়ে এসে পড়ে।ঠিক তেমনি চ্যাটবট তার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ ‘বিশ্বাস কাঠামো’ (conceptual networks) ও ব্যবহারকারীর ব্যক্তিত্বগত ইনপুট মিলিয়ে এক ধরণের “আকর্ষণ কেন্দ্র” তৈরি করে। আপনি যখন জানতে চান “আমার ভবিষ্যৎ কেমন হবে?” বা “আমি কীভাবে ভালো থাকব?”, তখন সে উত্তর দেয় এমনভাবে, যেন উত্তরটা একান্তই আপনার। কিন্তু আসলে এই উত্তর সামান্য ভাষার রূপভেদে একই ধরনের শত-সহস্র ব্যবহারকারীকে দেওয়া হচ্ছে।
এআই চ্যাটবটগুলো যে ভাষাগত কাঠামো ব্যবহার করে তা অনেকটা মানুষের নিউরোনাল সংযোগের মতো। গবেষকেরা একে বলছেন “Collective Neocortex”। এটি এমন এক কৃত্রিম মানসিক জগৎ, যা মানবজাতির লাখো চিন্তার সংমিশ্রণ থেকে গড়ে উঠেছে। এই কাঠামো যখন কোনো ব্যবহারকারীর ব্যক্তিত্বের সাথে যুক্ত হয়, তখন তারা নির্দিষ্ট ধরনের ধারণা বা গল্পের রূপরেখা অনুসরণ করে, যা অনেকের মধ্যেই অভিন্ন হয়। আপনি ভাবছেন আপনি কোনো মৌলিক কিছু চিন্তা করছেন, অথচ আপনি হয়তো চলছেন একটি পূর্বনির্ধারিত বুদ্ধিবৃত্তিক ট্র্যাকে।
সোশ্যাল মিডিয়া ইতিমধ্যেই আমাদের চিন্তার বৃত্ত সংকুচিত করেছে। এখন চ্যাটবট যদি আপনাকে শুধু আপনার মতের সমর্থন দেয়, বা আপনাকে এমন কিছু শেখায় যা আপনার ধারণারই সম্প্রসারণ—তবে আপনি কখনোই ভিন্নমতের যৌক্তিকতা জানবেন না। এই অবস্থাকে বলা হচ্ছে Echo Chamber। আপনি যা বিশ্বাস করেন, এআই আপনাকে তা-ই আরও জোরালোভাবে বিশ্বাস করায়। আপনি আবার তা পোস্ট করেন, শেয়ার করেন এবং সেই ডেটা দিয়ে আবার ভবিষ্যতের চ্যাটবট তৈরি হয়। এটি এক ভয়ানক ফিডব্যাক লুপ তৈরি করে—যার ফলে সমাজে মতের বৈচিত্র্য নয়, বরং চিন্তার সমতা (leveling) হয়ে ওঠে নিয়ম।
চ্যাটবটের এমন গাইডিং ন্যারেটিভ শুধু কেনাকাটা বা লাইফস্টাইলের ক্ষেত্রেই নয়, রাজনৈতিক মত গঠন, বিশ্বাস ব্যবস্থা এমনকি আত্মনাশ প্রবণতার দিকেও ব্যবহারকারীকে ঠেলে দিতে পারে। সম্প্রতি একটি ঘটনা মিডিয়ায় প্রকাশ পেয়েছে যেখানে GPT-4 ব্যবহারকারীকে দুনিয়া অবাস্তব বলে মানতে সাহায্য করে এবং পরিণতিতে সে আত্মহত্যা করে। এই উদাহরণগুলো দেখায় যে এটি শুধু প্রযুক্তি নয়, বরং এক নতুন প্রকার মানসিক পরামর্শদাতা, যেটির ভুল নির্দেশনা জীবন-মৃত্যুর পার্থক্যও তৈরি করতে পারে।
এই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রথম যে বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি, তা হলো স্বতন্ত্র ও বাহ্যিক নিরীক্ষা (independent audit)। বর্তমানে ব্যবহারকারীর উপর এআই কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, সেটি গবেষণার বাইরে রয়েছে। বেশিরভাগ তথ্যই শুধুমাত্র চ্যাটবট নির্মাতা কোম্পানিগুলোর অভ্যন্তরীণ ডেটার উপর নির্ভর করে। অথচ এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন সিদ্ধান্ত তৈরি হচ্ছে, যা মানুষের জীবনধারা, রাজনৈতিক মতবাদ, এমনকি মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। তাই একটি স্বাধীন নিরীক্ষা ব্যবস্থাপনা থাকা আবশ্যক, যেখানে নীতিনির্ধারক, গবেষক এবং নাগরিক সমাজ অংশ নেবে।
ব্যক্তিত্ব প্রোফাইলিং সংক্রান্ত স্পষ্ট সম্মতি প্রক্রিয়া (explicit opt-in consent) থাকা উচিত। ব্যবহারকারীদের অবশ্যই জানতে ও অনুমতি দিতে হবে, তার ব্যক্তিত্ব নিয়ে কোনো বিশ্লেষণ চালানো হচ্ছে কিনা। অনেক সময় ব্যবহারকারীর অজান্তেই তার দীর্ঘ কথোপকথনের ভিত্তিতে একটি চরিত্র বিশ্লেষণ তৈরি হয় যা অনেক সংবেদনশীল মনস্তাত্ত্বিক তথ্য ধারণ করে। এটি শুধুই প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতার ব্যাপার নয়, এটি একধরনের নৈতিক ন্যায্যতার প্রশ্ন।
চ্যাটবটগুলো ব্যবহারকারীর মতামতের সঙ্গে একমত হতেই বেশি আগ্রহী। এটি “sycophantic alignment” তৈরি করে, যার ফলে ব্যবহারকারী মনে করেন, তার ধারণাই সঠিক ও একমাত্র যুক্তিযুক্ত। কিন্তু একটি সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ গঠনের জন্য সক্রিয় বুদ্ধিদীপ্ত দ্বিমত অত্যন্ত জরুরি। চ্যাটবট ডিজাইন এমনভাবে হওয়া উচিত, যাতে কোনো একটি মতামতের সঙ্গে পরিচয় ঘটালে, সে তার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকল্প বা বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গিও সম্মানজনকভাবে তুলে ধরে। এটি শুধু মতামতের ভারসাম্যই নয়, বরং ব্যবহারকারীর চিন্তা-সীমাকে সম্প্রসারণ করে।
চ্যাটবট-নির্ভর সার্চ ইঞ্জিনগুলোর (যেমন, AI summaries in search results) ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সরলীকরণ বিপজ্জনক। যখন একটি জটিল প্রশ্নের উত্তরে একটি মাত্র উত্তর সমস্ত ব্যবহারকারীকে দেওয়া হয় তখন তা চিন্তার স্বাতন্ত্র্য নষ্ট করে। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর বিভিন্ন ব্যবহারকারীর প্রেক্ষাপটে ভিন্ন হতে পারে এবং সেটিই হওয়া উচিত। চিন্তা ও বিশ্লেষণের এই বহুস্তর বিশ্লেষণ না থাকলে চ্যাটবট নিজেই হয়ে ওঠে এক ধরনের একমুখী মতপ্রচার মাধ্যম।
মানবচিন্তার বহুত্বই আমাদের সভ্যতার অগ্রযাত্রার মূল। সেই বহুত্ব রক্ষার জন্য আমাদের এখনই প্রশ্ন তুলতে হবে চ্যাটবট কী জানে আমাদের সম্পর্কে? আর আমরা কি জানি, চ্যাটবট আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?


