কথিত আছে আফ্রিকার এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে একসময় ছিল এক গ্রাম, কিদুনো। তার নির্ভরযোগ্য কোনো মানচিত্র নেই, স্থির কোনো ভৌগোলিক অবস্থানও নেই। লোককথায় কেবল বলা হয়, একসময় সেখানে প্রাণ ছিল, মানুষ ছিল, ঘরবাড়ি ছিল। আর তারপর? হঠাৎ করেই জনপদটি উধাও হয়ে যায়।কেউ জানে না কীভাবে, কেউ জানে না কেন। কেউ বলে, কিদুনো সময়ের বাইরে চলে গিয়েছিল। কেউ বলে, এটি এক ‘অপঘাতক থ্রেশোল্ড’-এ পৌঁছে গিয়ে হারিয়ে যায় ইতিহাসের ছায়ায়।
এই গল্প শুনলে প্রথমেই মনে পড়ে যায় Roanoke কলোনি কিংবা কানাডার Anjikuni গ্রামের মতো রহস্যময় ঘটনাগুলো, যেখানে আস্ত একটি জনপদ নিখোঁজ হয়ে যায় অজানা কারণে। কিন্তু কিদুনোর রহস্য এতটাই অস্পষ্ট এবং তথ্যহীন যে এটি একধরনের লোককথা, লোকভয় কিংবা লোকমস্তিষ্কের কল্পনার দিকেও ইঙ্গিত করে।
আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চলের কিছু জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে আছে কিদুনোর নাম। মৌখিক সংস্কৃতির উপর নির্ভরশীল এই সমাজে প্রাচীন ইতিহাস রক্ষিত হয় গল্পের মাধ্যমে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। বলা হয়, কিদুনোর মানুষরা ছিল অত্যন্ত শান্তিপ্রিয়, প্রকৃতিপূজারী। তারা রাতের আকাশকে দেবতা মনে করত এবং নক্ষত্র দেখে ভাগ্য নির্ধারণ করত। কিন্তু একদিন হঠাৎ করেই, কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই, গ্রামটি অদৃশ্য হয়ে যায়।
বয়স্কদের মুখে শোনা যায় তারা নাকি মাঝেমধ্যে কিদুনোর নাম শোনে বাতাসে—যেন একটা হারিয়ে যাওয়া শব্দ হঠাৎ ফিরে আসে সময়ের ভাঁজ পেরিয়ে। কেউ কেউ বলে, তারা নির্জন রাতে বাঁশির মতো এক তীব্র আওয়াজ শুনেছেন, যেটি নাকি কিদুনোরই স্মৃতি।
এই গ্রামটি হয়তো বাস্তবিক অর্থে কখনও ছিল না, কিন্তু এটি একটি সমাজ-স্মৃতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। নৃবিজ্ঞানীরা বলেন, যখন কোনো জনপদ হারিয়ে যায় বা ধ্বংস হয়ে যায়, তখন সেই ক্ষত রূপ নেয় লোককাহিনীতে। কিদুনো সেই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের শূন্যস্থান পূরণ করে এক ধরনের কাল্পনিক শোকগাথা দিয়ে।
অনেক আফ্রিকান লোকবিশ্বাসে জনপদের অস্তিত্ব মাটির নিচেও চলতে পারে। তারা মনে করে, কিছু জনপদ ‘গভীর পৃথিবী’-তে চলে যায়—যেখানে মৃতেরা বাস করে, কিন্তু জীবিতদের ছায়ার মতো ঘুরে বেড়ায়। কিদুনোকে নিয়ে এমন ধারণাও আছে যে এটি কোনো আত্মার গ্রাম, যেটি পৃথিবীর ওপর স্তরে আর টিকে নেই, তবে তার ছায়া থেকে যায়।
আফ্রিকায় যুদ্ধ, মহামারি, খাদ্যসংকট কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো কারণেই অনেক জনপদ ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, দক্ষিণ সুদান বা মালির মতো দেশে স্থানীয় সহিংসতা এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ে বহু গ্রাম পরিত্যক্ত হয়। এই বাস্তবতার মধ্যে কিদুনোর গল্প হয়তো প্রতীক—মানুষের হারিয়ে যাওয়ার ভয়, অস্তিত্বের অনিশ্চয়তা এবং স্মৃতি মুছে যাওয়ার সম্ভাবনা।
এমনও হতে পারে, কিদুনো ছিল কোনো যাযাবর গোষ্ঠীর অস্থায়ী বসতি, যেটি নির্দিষ্ট নথিপত্র বা স্থাপত্য চিহ্ন রেখে যায়নি। আফ্রিকার বহু সংস্কৃতির মতো, এসব ইতিহাসও মৌখিক হওয়ায় হারিয়ে যেতে পারে কোনো বিপর্যয়ে। ইতিহাসবিদরা বলেন, মৌখিক ঐতিহ্যের উপর ভিত্তি করে নির্মিত কোনো জনপদের অস্তিত্বকে সরাসরি নাকচ করা যায় না।
বিজ্ঞান সময়চক্র বা টাইম-লুপ ধারণাকে আজও পরীক্ষা করছে। তবে লোকবিশ্বাসে সময়ের সীমানা ভেঙে কোনো বস্তু বা মানুষ হারিয়ে যেতে পারে।কিদুনোর এই ধারণা মূলত একধরনের ‘mythic trauma’-র প্রতিফলন—যেখানে সমাজ তাদের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিকে রহস্যের ছায়ায় রক্ষা করে। আবার কেউ কেউ এও বলেন—কিদুনো ছিল এক নিষিদ্ধ গ্রামের নাম, যেখানে “সময়” অন্যভাবে প্রবাহিত হতো। কেউ একবার সেখানে গেলে আর কখনও ফিরতে পারত না। এটিকে টাইম-এনক্লেভ বা সময়-ফাঁদ বলেও অভিহিত করা হয়। গবেষণার প্রয়োজন এই ধরনের গল্পগুলো নিয়ে গবেষণা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নৃবিজ্ঞান, লোকবিদ্যা এবং ইতিহাসবিদরা যদি আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনুসন্ধান চালান, তবে হয়তো কিদুনোর মতো জনপদের পেছনের বাস্তব গল্প বেরিয়ে আসবে। হয়তো পাওয়া যাবে কোনো ধ্বংসপ্রাপ্ত বসতি, হয়তো কিছু অনুবর্তী জাতিগোষ্ঠীর স্মৃতিচিহ্ন, যেগুলো প্রমাণ করতে পারে যে কিদুনো একসময় সত্যিই ছিল। ইউনেস্কো এবং আফ্রিকার স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ ধরনের লোকশ্রুতি সংগ্রহ করে ভবিষ্যতের গবেষণার ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। কিদুনোর মতো গল্পগুলো তখনই বাস্তবতার সাথে মিশে যায়, যখন এগুলোর উৎসে পৌঁছানো যায়।


