আমরা অনেক সময় নিঃসন্দেহে বলি “আমি এটা স্পষ্ট মনে করতে পারছি!” কিন্তু কী আশ্চর্য, গবেষণায় দেখা গেছে, এমন দৃঢ় স্মৃতিও অনেক সময় পুরোপুরি ভুল হতে পারে। এই ধরনের “False Memory” বা মিথ্যা স্মৃতি এমন এক মানসিক ঘটনা, যা আমাদের নিজের অভিজ্ঞতা হিসেবেই মনে হয়, কিন্তু বাস্তবে তা হয় নি, বা হয়ে থাকলেও বিকৃত রূপে মস্তিষ্কে গেঁথে গেছে।
False Memory এমন একটি মানসিক অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি এমন কিছু ঘটনা বা অভিজ্ঞতা মনে করেন, যা কখনো ঘটেইনি বা সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ঘটেছিল। এটি কল্পনা, সাজানো গল্প বা অন্যের অভিজ্ঞতা নিজের মনে করে নেওয়ার ফলেও হতে পারে।
কেউ হয়তো মনে করেন তিনি শৈশবে একবার রেলস্টেশনে হারিয়ে গিয়েছিলেন, অথচ বাস্তবে তিনি কখনোই রেলস্টেশনে যাননি।
মিথ্যা স্মৃতি কেন ঘটে?
স্মৃতি আমাদের মস্তিষ্কে কোনোরূপ রেকর্ডার নয়, বরং প্রতিবার যখন আমরা কিছু মনে করার চেষ্টা করি এটা পুনর্গঠিত হয়। এই reconstructive nature of memory-এর কারণেই অনেক সময় মস্তিষ্ক ফাঁকা জায়গা পূরণ করতে গিয়ে ভুল তথ্য বসিয়ে দেয়।
মস্তিষ্ক অনেক সময় অতীতের ফাঁকফোকর পূরণ করতে নতুন অংশ বানিয়ে নেয় যেটা আমরা সত্যি বলে বিশ্বাস করি। বাইরের কারও বক্তব্য বা প্রশ্নের ধরন মস্তিষ্ককে একটি বিকল্প স্মৃতি তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ করে। যেমন: “তোমার ছোটবেলায় যেদিন তুমি খুনসুটি করেছিলে… মনে আছে?”—এমন প্রশ্নের ফলেও ব্যক্তি এমন কিছু বিশ্বাস করতে পারেন যা হয়নি। কোন ঘটনার পর ভুল তথ্য পেলে, সেই ভুলটাই আমাদের মূল স্মৃতিতে ঢুকে যায়।
নিউরোসায়েন্স কী বলছে?
স্মৃতি সংরক্ষণের পেছনে রয়েছে আমাদের হিপোক্যাম্পাস (hippocampus), অ্যামিগডালা (amygdala) ও প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স (prefrontal cortex)-এর মতো অংশগুলো। গবেষণায় দেখা গেছে, এই অংশগুলো যখন ভুলভাবে সক্রিয় হয় বা ভুল তথ্য পুনরায় encode করে, তখনই মিথ্যা স্মৃতি গড়ে ওঠে।
১৯৯৫ সালে Elizabeth Loftus নামের এক মনোবিজ্ঞানী এমন এক পরীক্ষায় অংশ নেন যেখানে তিনি অংশগ্রহণকারীদের মনে করান যে তারা শৈশবে শপিংমলে হারিয়ে গিয়েছিল। ফলাফল? অনেকেই স্পষ্টভাবে সেই হারিয়ে যাওয়ার স্মৃতি বর্ণনা করে ফেলেন, যা ছিল পুরোপুরি বানানো!
স্মৃতি কেবল তথ্যের গুদাম নয়, তা আবেগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। Emotional tagging-এর মাধ্যমে আবেগপূর্ণ ঘটনা বেশি মনে থাকে, কিন্তু তা বিকৃতও হতে পারে। অনেক সময় খুব ভয়াবহ বা আনন্দময় ঘটনার স্মৃতি নাটকীয় হয়ে যায়, কারণ মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা তখন অতিরিক্ত সক্রিয় থাকে। আবার ট্রমা বা মানসিক যন্ত্রণার ক্ষেত্রে অনেকেই কিছুই মনে করতে পারেন না, এটিও একধরনের আত্মরক্ষামূলক ‘false memory’ বা স্মৃতিহীনতা।
আমাদের চারপাশের পরিবেশ, পরিবার, মিডিয়া সবকিছুই আমাদের স্মৃতি গঠনে প্রভাব ফেলে। Collective memory বা সম্মিলিত স্মৃতি অনেক সময় একাধিক মানুষের মধ্যে একসঙ্গে তৈরি হয়, যদিও ঘটনা সত্য নয়। ‘ম্যান্ডেলা ইফেক্ট’ (Mandela Effect) নামক একটি জনপ্রিয় ঘটনা যেখানে বহু মানুষ ভুল করে মনে করেন যে নেলসন ম্যান্ডেলা ১৯৮০-র দশকে কারাগারে মারা গিয়েছিলেন। বাস্তবে তা হয়নি। এই ধরণের মিথ্যা স্মৃতি ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজজুড়ে ছড়ায়।
আমাদের মস্তিষ্ক কি ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল মনে রাখে?
এই প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ এবং না দু’টোই বলা যায় । মস্তিষ্ক “ইচ্ছাকৃত”ভাবে ভুল মনে রাখে না ঠিকই, কিন্তু নিজের সুরক্ষার জন্য, মানসিক স্থিতি বজায় রাখতে, কিংবা স্মৃতির ফাঁক পূরণ করতে এমন স্মৃতি তৈরি করে, যেগুলো প্রকৃত সত্য নয়। কোনো ট্রমাটিক বা কষ্টকর স্মৃতি মস্তিষ্ক দমন করে রাখতে পারে বা বিকৃত রূপে মনে রাখতে পারে, এটা একটা survival mechanism।
False memory আমাদের শিক্ষা দেয় যে স্মৃতিকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা ঠিক নয়। আমরা নিজেদের জীবনের গল্পগুলো নির্ভুলভাবে মনে রাখি, এই ধারণা বাস্তবে টেকে না। শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী যারা মানুষের মুখের তথ্যের উপর নির্ভর করেন, তাদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। শিশুদের ক্ষেত্রেও মিথ্যা স্মৃতি সহজেই তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে যাদের মস্তিষ্ক এখনো পুরোপুরি গঠিত হয়নি। তাই শিশুদের সাক্ষ্য বা বক্তব্যের মূল্যায়ন করতে হলে এই দিকগুলো খেয়াল রাখা জরুরি।
এর সম্পূর্ণ প্রতিরোধ হয়তো সম্ভব নয়, তবে কিছু কৌশলে মিথ্যা স্মৃতির প্রভাব কমানো যায়। ঘটনা লিখে রাখা বা ডকুমেন্ট করা, Group discussion এ যাচাই করা, মনোযোগ দিয়ে শোনা ও সত্য যাচাই করা, আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।
স্মৃতি মানে শুধু তথ্যের সংগ্রহ নয়, এটা অনুভূতির, দৃষ্টিভঙ্গির, সমাজের ও মস্তিষ্কের যৌথ নির্মাণ। মিথ্যা স্মৃতি আমাদের শেখায় সত্যের ধারণা অনেক সময় আপেক্ষিক এবং মানুষের মন কতোটা জটিল।


