আপনার বিষণ্ণতার জন্য দায়ী হতে পারে চিনিও !

প্রাকৃতিকভাবেই ফল, সবজি ও শস্যের মতো জটিল শর্করায় চিনি থাকে। আবার পাস্তা, কেক, বেক করা খাবার, রুটি, কোমলপানীয় ও ক্যান্ডির মতো প্রক্রিয়াজাত খাবারেও থাকে অতিরিক্ত চিনি। তাই প্রতিদিন কী খাচ্ছেন, আর তার প্রভাব কীভাবে আপনার শরীর ও মনের উপর পড়ছে-তা জানা জরুরি। বিশেষ করে যখন বিষয়টি হতাশা বা বিষণ্ণতার মতো মানসিক অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত।

চিনির সঙ্গে হতাশার সম্পর্ক – প্রথমে শুনতে অবাক লাগলেও, আপনার প্রতিদিনের চিনিমাখা চা বা কোমল পানীয় মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হতে পারে। সাম্প্রতিক বেশ কিছু গবেষণায় উঠে এসেছে, অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমাদের মস্তিষ্কে – বিশেষ করে মুড রেগুলেটিং হরমোনগুলোর ওপর। চিনি শরীরে প্রবেশ করার পর দ্রুত রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়ায়। এর ফলে তাৎক্ষণিকভাবে আপনি সাময়িক এক ধরনের আনন্দ বা উদ্দীপনা অনুভব করেন-যাকে অনেকেই বলেন “sugar rush”। এই সময় শরীরে ডোপামিন নিঃসরণ হয়, যেটি হলো আনন্দের অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত একটি নিউরোট্রান্সমিটার। তবে এই সুখ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ করে আবার নেমে গেলে, আপনি ক্লান্তি, বিরক্তি বা মনমরা ভাব অনুভব করতে পারেন। এই ওঠানামা চলতে থাকলে তা মুডকে দীর্ঘমেয়াদে অস্থির করে তোলে, সৃষ্টি করে মানসিক অবসাদ বা হতাশার।

ব্রিটিশ জার্নাল অব সাইকিয়াট্রিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিতভাবে উচ্চমাত্রায় চিনি গ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগের হার অনেক বেশি। গবেষণাটিতে ৮,০০০ পুরুষ ও নারীর খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক স্বাস্থ্যের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। দেখা যায়, দিনে অন্তত ৬৭ গ্রাম চিনি গ্রহণকারীদের মধ্যে পরবর্তী পাঁচ বছরে হতাশা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা ২৩% বেশি। চিনির আরেকটি নেতিবাচক প্রভাব হলো, এটি শরীরে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ সৃষ্টি করে। এই প্রদাহ মস্তিষ্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।নিউরোইনফ্ল্যামেশন বা মস্তিষ্কে প্রদাহ, সেরোটোনিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নিউরোট্রান্সমিটারের কার্যকারিতা ব্যাহত করে, যা হতাশা সৃষ্টি বা বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে আপনি ধীরে ধীরে বিষণ্ণ হয়ে পড়েন, যদিও আপনি হয়তো বুঝতেই পারেন না যে এটি আপনার খাবারের কারণেই হচ্ছে।

চিনির প্রতি নির্ভরতা বা আসক্তি আরও একটি বড় সমস্যা। কারণ বারবার চিনি খাওয়ার ফলে মস্তিষ্ক নতুন করে ডোপামিনের অপেক্ষা করে, যা চিনি না পেলে মুড ডাউন করে দেয়। এতে করে আপনি বারবার মিষ্টিজাত খাবারের দিকে ঝুঁকেন এক ধরনের চক্র তৈরি হয়, যেটি থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক হলো চিনি খাওয়ার প্রভাব সবাই একভাবে অনুভব করেন না।পুরুষদের মধ্যে এই প্রভাব নারীদের তুলনায় বেশি তীব্র হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, হরমোনগত পার্থক্যের কারণে পুরুষদের মস্তিষ্কে চিনির প্রভাব আরও গভীরভাবে পড়ে, বিশেষ করে হতাশার সূচনাপর্বে।

চিনি কি মাদক?
এক গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের চিনি গ্রহণকারী অংশ বারবার উচ্চমাত্রার চিনি গ্রহণের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে না। ইঁদুরের ওপর চালানো পরীক্ষামূলক গবেষণায় এমনও দেখা গেছে যে, চিনি কখনো কখনো কোকেনের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়। অর্থাৎ চিনির প্রতি আসক্তি কেবল অভ্যাস নয়-এটি হতে পারে নেশার মতোই শক্তিশালী। পানীয় থেকে সস, চকলেট থেকে স্যান্ডউইচ-প্রতিদিনের প্রায় সব খাবারেই লুকিয়ে থাকে চিনি। তাই ধীরে ধীরে কমিয়ে আনাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

প্রদাহ ও হতাশার অদৃশ্য যোগসূত্র
প্রাকৃতিক ফল ও সবজি দিয়ে তৈরি খাদ্যতালিকা শরীরের প্রদাহ কমায়। বিপরীতে, প্রক্রিয়াজাত ও চিনিযুক্ত খাবার প্রদাহ বাড়ায়। আর দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের সঙ্গে রয়েছে ক্যানসার, হাঁপানি, বিপাকীয় সমস্যা ও হতাশার সংযোগ। গবেষণামতে, হতাশা ও প্রদাহের মধ্যে বেশ কিছু মিল রয়েছে-যেমন, ঘুমে ব্যাঘাত, খাবারে অরুচি বা অতিরিক্ত খাওয়া, দেহে অস্বাভাবিক ব্যথা অনুভব ইত্যাদি। তাই চিনিমুক্ত ডায়েট মানেই শুধু ওজন কমানো নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও যত্ন নেওয়া ।

বেক করা খাবারও দায়ী
মাফিন, পেস্ট্রি, ডোনাটের মতো বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুত বেক করা খাবার খেতে যেমন সুস্বাদু, তেমনি এগুলো হতে পারে হতাশার উৎস।স্পেনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিমাত্রায় বেক করা খাবার খাওয়ার সঙ্গে হতাশার ঝুঁকি ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। এর পেছনে মূল দায়ী ট্রান্স ফ্যাট, যা প্রদাহের অন্যতম কারণ এবং হৃদ্ রোগের ঝুঁকিও বাড়ায়। বাজারের প্রায় সব বেক করা খাবারে এই ফ্যাট থাকে।

চিনিকে ‘না’ বলার উপায়

  • কোমল পানীয়, সোেডা, এনার্জি ড্রিংক বাদ দিন। চিনি ছাড়া চা, সাধারণ পানি বা লেবুর রস মেশানো পানি খান।
  • খেজুর, তাজা ফল বা এক টুকরো ডার্ক চকলেট হতে পারে বিকল্প।
  • ভালো শর্করা বেছে নিন: হোল গ্রেইন বা গোটা দানার শস্য খান।
  • ফুড লেবেল পড়ুন, কেনার আগে খাবারের উপকরণ তালিকায় নজর দিন। চিনি থাকলে বেছে নিন বিকল্প।
  • পরিবার বা বন্ধুর সঙ্গে ‘চিনি ছাড়ার চ্যালেঞ্জ’ নিন। দুই সপ্তাহ চেষ্টা করলেই শরীর ও মনের ইতিবাচক পরিবর্তন টের পাবেন।
    চিনির প্রতি নির্ভরতা কমানো মানে শুধু রোগ প্রতিরোধ নয়, নিজেকে আরো হালকা, ফুরফুরে ও নিয়ন্ত্রিত রাখা। এখনই শুরু করুন, ক্ষতিকর মিষ্টির অভ্যাস বদলান।



LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন