বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যা একাধিক দেশের মধ্যে ভাগ করা নদী বা হ্রদের অববাহিকায় বসবাস করে। জনগণ, বাস্তুতন্ত্র এবং অর্থনীতির সুস্থতার জন্য এই জল সম্পদকে টেকসইভাবে পরিচালনার জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর একসাথে কাজ করা প্রয়োজন।তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমনকি সুপেয় পানির মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের ক্ষেত্রেও অনেক দেশ এই সহযোগিতা থেকে সরে আসার প্রবণতা দেখিয়েছে। প্রায় ৪০০০ বছর আগে সুমেরীয় নগর-রাষ্ট্র লাগাশ ও উম্মার মধ্যে টাইগ্রিস নদীর একটি খালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তীব্র সংঘাত শুরু হয়। এই দ্বন্দ্ব ২৫৫০ খ্রিস্টপূর্বে মেসিলিম চুক্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়, সেটি ছিলো আন্তর্জাতিক জলচুক্তির প্রথম দৃষ্টান্ত। এই চুক্তি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে না পারলেও একটি মডেল তৈরি করেছিল।
বিশ্বের ৩১৩টি পৃষ্ঠজল অববাহিকা, ৪৬৮টি আন্তঃসীমান্ত ভূগর্ভস্থ জলাধার এবং ৩০০টিরও বেশি আন্তঃসীমান্ত জলাভূমির ব্যবস্থাপনা নিয়ে ১৮০০ সালের শেষ ভাগ থেকে এবং বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সহযোগিতার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপে, রাইন ও দানিউব নদীর পানি ব্যবস্থাপনার জন্য দেশগুলো একাধিক চুক্তি করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মেকং নদী সম্পর্কিত প্রযুক্তিগত আলোচনা জলসম্পদ ব্যবস্থাপনায় উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রেখেছে। তবে সম্প্রতি আমরা দেখছি, অনেক দেশ জলসম্পদ ব্যবস্থাপনায় একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যেটি বহুপাক্ষিক সহযোগিতাকে দুর্বল করছে।
কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া নদী চুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, কারণ ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন এই চুক্তির হালনাগাদ সংক্রান্ত আলোচনাকে স্থগিত করেছে। একইভাবে দক্ষিণ আফ্রিকার জাম্বেজি নদী অববাহিকায় দেশগুলো আগের মতো একে অপরকে অবহিত না করেই বাঁধ নির্মাণ করছে। নাইল ও আরাল সাগরের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০১০ সালের পর থেকে বহুপাক্ষিক জল চুক্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০২০ সালের পর মাত্র ১০টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং মাত্র দুটি যৌথ প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়েছে। অনেক নদী অববাহিকায় কোনো ধরনের চুক্তি বা প্রতিষ্ঠানই নেই।
বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো কার্যকর হয়নি। কঙ্গো, রুয়ান্ডা ও বুরুন্ডির মধ্যে রুজিজি নদী ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সংস্থা গঠনের পরিকল্পনা থাকলেও তা আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়নি। বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেও কিছু দেশ নিজেদের প্রত্যাহার করছে। আরাল সাগর সংরক্ষণ তহবিল (IFAS) ১৯৯৩ সালে পাঁচটি দেশ দ্বারা গঠিত হয়েছিল, কিন্তু ২০১৬ সালে কিরগিজস্তান তাদের সদস্যপদ স্থগিত করে, যা সংস্থাটির কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। নাইল অববাহিকায় মিশর ও সুদান ২০১০ সালে অংশগ্রহণ স্থগিত করেছিল, যদিও সুদান ২০১২ সালে ফিরে আসে। কিন্তু মিশর এখনও এই উদ্যোগের বাইরে রয়েছে।
জলসম্পদ সহযোগিতার এই সংকট শুধু পানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি বিশ্বব্যাপী বহুপাক্ষিক সমস্যার সমাধানে দেশগুলোর আগ্রহ কমে যাওয়ার একটি প্রতিফলন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ন্যাটো এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।আর্জেন্টিনাও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছে। পশ্চিম আফ্রিকায় মালি, বুর্কিনা ফাসো ও নাইজার আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থা ECOWAS থেকে বেরিয়ে গেছে। বিশেষ করে পরিবেশের ক্ষেত্রে এই প্রবণতার নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করেছে এবং প্লাস্টিক দূষণ হ্রাসে বৈশ্বিক চুক্তি বাস্তবায়নে কঠিনতা দেখা দিচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাদুপানির সংকট বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে জলসম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার দেখা যাচ্ছে।ফলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া জলসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে। লেক চাদ একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে। ১৯৬৪ সালে ক্যামেরুন, চাদ, নাইজার ও নাইজেরিয়া লেক চাদ অববাহিকা কমিশন গঠন করেছিল। কিন্তু দেশগুলো কখনোই পূর্ণ সহযোগিতায় সম্মত হয়নি। এর ফলে স্থানীয় জনগণের দারিদ্র্য বাড়িয়ে দিয়েছে এবং তাদের জীবিকা সংকুচিত করে লেক চাদের আকার প্রায় ৯০% হ্রাস পেয়েছে। এই দুর্বল পরিস্থিতি জঙ্গি গোষ্ঠী বোকো হারামের উত্থানের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করেছে।
বহুপাক্ষিক সহযোগিতার প্রতি দেশগুলোর কমে যাওয়া আগ্রহ একটি গুরুতর সংকেত। যদি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ পানি টেকসইভাবে এবং আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতার মাধ্যমে ব্যবস্থাপিত না হয়, তবে শুধু জলসম্পদ নয় আঞ্চলিক শান্তি, অর্থনীতি ও পরিবেশও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।


