কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের প্রতিবাদে এবং ন্যায়সংগত দাবি আদায়ে রাজপথে নেমেছিলেন নারী শ্রমিকেরা। এই শ্রম আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ পথপরিক্রমায় চালু হয় ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’। গত শতকের সত্তরের দশকের মাঝামাঝি দিবসটি জাতিসংঘের স্বীকৃতি পায়। ১৭৯২ সালে ইংরেজ লেখক মেরি ওলস্টোনক্র্যাফ্ট তাঁর ‘আ ভিনডিকেশন অব দ্য রাইটস অব উইমেন’ শীর্ষক বইয়ে নারীদের শিক্ষাগত ও সামাজিক সমতার পক্ষে জোরালো বক্তব্য তুলে ধরেন। নিউইয়র্কে ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ প্রথমবারের মতো ধর্মঘট পালন করেন নারী টেক্সটাইলকর্মীরা। এই কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁরা মজুরি বৈষম্য ও বৈরী কর্মপরিবেশের প্রতিবাদ জানান। সমঅধিকারের পাশাপাশি কম কর্মঘণ্টা ও উপযুক্ত মজুরি দাবি করেন তাঁরা।
১৯০৮ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্ক শহরের রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখান প্রায় ১৫ হাজার নারী শ্রমিক। তাঁরা শিশুশ্রম ও বৈরী কর্মপরিবেশের প্রতিবাদ জানান। কর্মঘণ্টা কমানো, বেতন বাড়ানো ও ভোটাধিকার দাবি করেন তাঁরা। এই আন্দোলন নারীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার একটি বড় নজির তৈরি করে। সোশ্যালিস্ট পার্টি অব আমেরিকার উইমেন্স ন্যাশনাল কমিটির প্রধান থেরেসা মালকিয়েল ১৯০৯ সালে একটি জাতীয় নারী দিবসের ধারণা দেন যা দলটি অনুমোদন করে। দলীয় ঘোষণা অনুযায়ী, ১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে প্রথমবারের মতো ‘জাতীয় নারী দিবস’ পালিত হয়।
১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে ‘সেকেন্ড ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট উইমেন্স কনফারেন্স’ হয়। এই সম্মেলনে জার্মানির সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা ক্লারা জেটকিন একটি বার্ষিক ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ চালুর ধারণা উপস্থাপন করেন। এই দিবসে নারীরা নিজেদের দাবি জানাবেন। তবে ক্লারা জেটকিন তাঁর প্রস্তাবে দিবসটি বিশ্বজুড়ে পালনের ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট দিন-তারিখ উল্লেখ করেননি। কোপেনহেগেন সম্মেলনের সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় ১৯১১ সালের ১৯ মার্চ ডেনমার্ক, অস্ট্রিয়া, জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডে প্রথমবারের মতো ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ পালিত হয়। পরে অবশ্য ৮ মার্চ নির্ধারিত হয়। ১৯১৩ সালে ৮ মার্চ রুশ সাম্রাজ্যে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়। জার্মানিতে ১৯১৪ সালের ৮ মার্চ প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়।
১৯১৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি (গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে ৮ মার্চ) রুশ নারী টেক্সটাইলকর্মীরা ‘রুটি ও শান্তি’র দাবিতে ধর্মঘট-বিক্ষোভ শুরু করেন, যা ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের সূত্রপাত ঘটায়। রুশ বিপ্লবে নারীদের ভূমিকার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিপ্লবের মহানায়ক ভ্লাদিমির লেনিন ১৯২২ সালে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক কর্মজীবী নারী দিবস ঘোষণা করেন। দিনটিতে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন তিনি। ১৯৪৯ সালে বিপ্লবের পর চীন আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশের সংখ্যা বাড়তে থাকে। জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালকে ‘আন্তর্জাতিক নারী বর্ষ’ ঘোষণা করে। একই বছর বিশ্ব সংস্থাটি প্রথমবারের মতো ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করে।
দুই বছর পর ১৯৭৭ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক রূপ পায়। ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ১০০ বছর পূর্তি হয়েছে। আর ২০২৫ সালে দিবসটির ১১৪ বছর পূর্ণ হচ্ছে।


