২০০৯ সাল থেকে প্রতি বছর ২০ ফেব্রুয়ারি পালিত হয়ে আসছে বিশ্ব সামাজিক ন্যায়বিচার দিবস। যার লক্ষ্য হলো সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং বেকারত্ব মোকাবিলার প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা। এটি মূলত বৈশ্বিক সম্প্রীতি গঠন, বৈষম্য হ্রাস, দারিদ্র্যতা লাঘব এবং একটি ন্যায়সঙ্গত সামাজিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দিকে গুরুত্ব দেয়।কিন্তু এই নির্দিষ্ট দিনের বাইরেও সামাজিক ন্যায়বিচার বিশ্বব্যাপী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বিভিন্ন দেশে প্রায় প্রতিদিনই মানুষ তাদের নিজস্ব বাস্তবতা অনুযায়ী ন্যায়বিচারের দাবি তুলে ধরে। বড় বৈশ্বিক শক্তিগুলোর ক্ষমতা, শাসক শ্রেণির ভূমিকা, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আধিপত্য, কিংবা জনগণ ও পরিবেশবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর দখলদারি নিয়ে প্রশ্ন না তুললে আন্তর্জাতিক সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণাটি অর্থবহ হতে পারে না। তাই এই প্রশ্ন আমাদের দেশে যেমন জরুরি তেমনি বৈশ্বিক পর্যায়েও তোলা উচিত।
আমরা জানি বৈশ্বিকভাবে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ বা ব্যয়ের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হলো মানুষকে ধ্বংসের জন্য তৈরি শিল্প! অর্থাৎ যুদ্ধশিল্প, অস্ত্রশস্ত্র, এবং নজরদারি ব্যবস্থা। বর্তমানে এ খাতে ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার। যার ৫০ শতাংশের বেশি ব্যয় যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে করে থাকে। এই বিপুল অর্থব্যয় যুদ্ধ, সহিংসতা এবং দমনমূলক কার্যক্রমকে চালিত করে। যেগুলো আবার বিভিন্ন দেশে স্বৈরাচারী শাসনকে শক্তিশালী করে এবং জনগণ ও পরিবেশবিরোধী কর্পোরেট শক্তির আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক ইতিহাসে আমরা এটি ইরাক, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অংশ, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় প্রত্যক্ষ করেছি। নজরদারি ব্যবস্থা, সামরিক হস্তক্ষেপ এবং বিভিন্ন দেশে যুদ্ধবাদী গোষ্ঠীগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা বিশ্বব্যাপী এই শোষণ কাঠামোকে আরও প্রসারিত করেছে। এই সম্প্রসারণের পাশাপাশি, আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন দেশে লুটেরা অভিজাতদের উত্থান এবং স্বৈরাচারী, একনায়কতান্ত্রিক শাসনের বিস্তার।
এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক সামাজিক ন্যায়বিচারের সম্পূর্ণ বিপরীত। তাই যখনই আমরা আন্তর্জাতিক সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে কথা বলি তখন প্রথমেই এই বৈশ্বিক অপশৃঙ্খলা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা অপরিহার্য। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে হলে জনগণের অধিকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন এজেন্ডা তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশকে উদাহরণ হিসেবে ধরলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল আদর্শই ছিল সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং বৈষম্য, শোষণ, নিপীড়ন ও আধিপত্যমুক্ত একটি সমাজ গঠন করা। কিন্তু যুদ্ধোত্তর সময়ে আমরা নানা পর্যায়ে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছি। এর মধ্যে এমন এক শ্রেণি তৈরি হয়েছে যাদের হাতে সম্পদ ও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে গেছে। যার ফলে বৈষম্য ও দারিদ্র্যতার হার আরও বেড়েছে। টেকসই উন্নয়নের বদলে আমরা টেকসই দারিদ্র্যের দিকে এগিয়েছি। পরিবেশ ধ্বংস হয়েছে এবং জাতিগত, শ্রেণিগত ও ধর্মীয় বিভাজন আরও গভীর হয়েছে।
ভারতের দিকে তাকালেও আমরা একই চিত্র দেখতে পাই। চরম দারিদ্র্য ও অসমতা সত্ত্বেও কিছু ভারতীয় নিয়মিতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় স্থান করে নিচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে দেশটি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি দরিদ্র মানুষের বসবাসের স্থান হিসেবেও পরিচিত। যেখানে ব্যাপক বৈষম্য ও বঞ্চনা বিরাজমান। পাশাপাশি রাষ্ট্রের সামরিকায়নও সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। এমনই এক বাস্তবতা পাকিস্তানেও। সেখানে ক্রমাগত সামরিকায়ন চলছে, দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়ে চলেছে। সাথে রাষ্ট্রশক্তি মূলত সামরিক বাহিনীর হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে সাধারণ জনগণ তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের নির্বাচনের পর বৈশ্বিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাপী মানুষের সংহতি ও ঐক্যের পরিবর্তে ক্রমবর্ধমান মার্কিন আধিপত্য এবং সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের কারণে নতুন এক বৈশ্বিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের আগ্রাসন, ঔপনিবেশিক দখলদারত্ব ও গণহত্যা নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ৪৫,০০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। কিন্তু ইসরায়েলের দায়ীদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচারের আওতায় আনা হয়নি। বরং যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন তাদেরকে স্বাগত জানিয়েছে, সম্মানিত করেছে এবং ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে আরও আগ্রাসন চালানোর জন্য উৎসাহিত করেছে। তবে আশার বিষয় হলো এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে মানুষ রাস্তায় নেমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসরায়েলের নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়েছে। অনেক ইহুদি ধর্মীয় নেতা ও ব্যক্তি ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। বহু দেশে বড় আকারের বিক্ষোভঅনুষ্ঠিত হয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী জনগণ ইসরায়েলের গণহত্যা ও দখলদারত্বের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।
এই প্রতিবাদ ও সংহতি যুদ্ধ, আগ্রাসন, নতুন ঔপনিবেশিকতা, নিওলিবারেল দখলদারত্ব এবং পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর ও অর্থবহ প্রতিরোধের চিত্র তুলে ধরে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে জনগণের আন্দোলন ও সংহতি প্রকৃত অর্থেই পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে আমরা চারটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিণতি অনুমান করতে পারি। প্রথমত, বিশ্বব্যবস্থা আরও ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে পারে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন একটি চরম ফ্যাসিবাদী শক্তি বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বিস্তার করবে। দ্বিতীয়ত, বিশ্বে একাধিক শক্তিকেন্দ্র তৈরি হতে পারে যেখানে বিভিন্ন শক্তি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবে এবং একক আধিপত্য থাকবে না।
তৃতীয়ত, পরিবর্তনের লড়াই আরও তীব্র হতে পারে, যেখানে শাসক ও জনগণের মধ্যে সংঘর্ষ চলতেই থাকবে। চতুর্থত, বিশ্বব্যবস্থার বিপ্লবী পরিবর্তন ঘটতে পারে। এই চারটি সম্ভাবনার মধ্যে সামাজিক ন্যায়বিচার সমতা এবং পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে বৈশ্বিক শাসকশ্রেণির পুঁজিবাদী আগ্রাসনকে প্রতিহত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে। বর্তমান বিশ্ব এক অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন। পরিবেশ ধ্বংস ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই সংকট তীব্র হচ্ছে। সারা বিশ্বে নিরাপত্তাহীনতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে এবং মানুষের জীবনমান ক্রমশ হুমকির মুখে পড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে পরিবেশ আন্দোলন এক শক্তিশালী পরিবর্তনশীল শক্তিতে পরিণত হচ্ছে। যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনবিরোধী আন্দোলন এবং সামাজিক সমতার আন্দোলন মিলিত হয়ে আন্তর্জাতিক জনশক্তি গঠনের সম্ভাবনা তৈরি করছে যা বৈশ্বিক পর্যায়ে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য। তবে যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কথা বলে তারা প্রায়ই অন্যায় সৃষ্টিকারীদের সঙ্গেই আপস করে। ফলে আন্তর্জাতিক সামাজিক ন্যায়বিচারের এজেন্ডা এবং এই দিবসের তাৎপর্য অনেকাংশে অর্থহীন হয়ে পড়ে। এই বিশ্ব সামাজিক ন্যায়বিচার দিবসের দিনটিকে অর্থবহ করতে এবং সামাজিক ন্যায়বিচারকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রতিটি দেশে প্রকৃত সংগ্রামের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং বিশ্বব্যাপী জনগণের মধ্যে দৃঢ় সংহতি গড়ে তুলতে হবে।
তবে যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কথা বলে তারা প্রায়ই অন্যায় সৃষ্টিকারীদের সঙ্গেই আপস করেএই বিশ্ব সামাজিক ন্যায়বিচার দিবসের দিনটিকে অর্থবহ করতে এবং সামাজিক ন্যায়বিচারকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রতিটি দেশে প্রকৃত সংগ্রামের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং বিশ্বব্যাপী জনগণের মধ্যে দৃঢ় সংহতি গড়ে তুলতে হবে।ফলে আন্তর্জাতিক সামাজিক ন্যায়বিচারের এজেন্ডা এবং এই দিবসের তাৎপর্য অনেকাংশে অর্থহীন হয়ে পড়ে।


