জ্যোতিষবিদ্যা (Astrology) হাজার বছরের পুরোনো একটি চর্চা। যেটি গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান ও গতি বিশ্লেষণের মাধ্যমে মানবজীবনের বিভিন্ন দিক নির্ধারণের চেষ্টা করে। বিভিন্ন সভ্যতার ধর্ম, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবনে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে আধুনিক বিজ্ঞান একে পরীক্ষামূলকভাবে সত্যায়িত করেনি বরং ছদ্মবিজ্ঞান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। জ্যোতিষবিদ্যার শিকড় বহু প্রাচীন সভ্যতার মধ্যে নিহিত। মূলত ব্যাবিলনীয় সভ্যতা (খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০) থেকেই জ্যোতিষবিদ্যার প্রাথমিক রূপের উত্থান ঘটে। সেখান থেকে এটি গ্রিক, রোমান, ভারতীয় ও চীনা সভ্যতাতেও ছড়িয়ে পড়ে।
ব্যাবিলনীয়রা প্রথম জ্যোতিষচর্চা শুরু করে। যেখানে তারা গ্রহ ও নক্ষত্রের অবস্থানের মাধ্যমে ভবিষ্যদ্বাণী করত। এখান থেকেই বারোটি রাশির ধারণা জন্ম নেয়। তাদের জ্যোতিষশাস্ত্রের গোড়া ছিল মহাকাব্যিক সময়ে। প্রায় ৫ হাজার বছর আগে যখন তারা আকাশের নক্ষত্র এবং গ্রহের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেছিল।ব্যাবিলনীয়রা মহাকাশের চলাচল এবং পৃথিবী থেকে তার সম্পর্ক বুঝতে চেষ্টা করত। যেগুলো তাদের সমাজের ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
ব্যাবিলনীয়দের জ্যোতিষশাস্ত্রের কিছু মূল বৈশিষ্ট্য ছিল তারা সূর্য, চাঁদ এবং অন্যান্য গ্রহের চলাফেরা লক্ষ্য করত। তারা বিশ্বাস করত যে, এই পবষবংঃরধষ নড়ফরবং মানুষের জীবনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তারা বিশেষভাবে ১২টি রাশিচক্র বা “জোডিয়াক সাইন” সম্পর্কে জানতে শুরু করেছিল, যেগুলো আজও আধুনিক জ্যোতিষশাস্ত্রে ব্যবহৃত।
বিশেষভাবে আকাশের নির্দিষ্ট নক্ষত্রের অবস্থান এবং তার সম্পর্ক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত হিসেবেও ব্যবহার করত। তারা বিশ্বাস করত কোনো এক বিশেষ নক্ষত্রের অবস্থান ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।ব্যাবিলনীয় সমাজের ধর্মীয় নেতা এবং রাজা-রাজরা জ্যোতিষশাস্ত্র ব্যবহার করতেন ভবিষ্যতের ভবিষ্যদ্বাণী এবং রাজ্য পরিচালনা বিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণে। তারা গ্রহের গতিবিধি দেখে ভালো বা খারাপ সময় বুঝতে চেষ্টা করত এবং সেই অনুযায়ী যুদ্ধ, বিবাহ, অর্থনৈতিক কার্যক্রম ইত্যাদি পরিকল্পনা করত।
ব্যাবিলনীয়রা প্রথম “মাটাম” নামে একটি টেবিল তৈরি করেছিল, যা আকাশের বিভিন্ন গতি এবং সময়ের ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত প্রেডিকশন দিত। এই টেবিলগুলি জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রথম দিকের সবচেয়ে প্রাচীন রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।ব্যাবিলনীয়দের জ্যোতিষশাস্ত্র এবং তার পরবর্তী বিকাশ, পরে গ্রীক, ভারতীয়, আরব এবং পশ্চিমা সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলেছিল এবং আধুনিক জ্যোতিষশাস্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেছিল।গ্রিক ও রোমান সভ্যতায় গ্রিক দার্শনিক প্লেটো ও অ্যারিস্টটল জ্যোতিষবিদ্যার সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্ক খুঁজতে চেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে টলেমি (Ptolemy) তাঁর ‘টেট্রাবিবলস’ বইতে পশ্চিমা জ্যোতিষবিদ্যার ভিত্তি স্থাপন করেন।
বৈদিক জ্যোতিষ ভারতীয় ধর্ম ও দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি মূলত চন্দ্র ও সূর্যের গতির ওপর ভিত্তি করে ভাগ্য গণনা করে। প্রাচীন শাস্ত্র ‘বৃহৎ সংহিতা’ এবং ‘বৃহৎ পারাশর হোরা শাস্ত্র’ জ্যোতিষবিদ্যার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।চীনা জ্যোতিষবিদ্যা দ্বাদশ প্রাণী রাশির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। যারা মানুষের জন্মতারিখের ওপর নির্ভর করে ভাগ্য নির্ধারণ করে।বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে জ্যোতিষবিদ্যা পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণিত নয়। আধুনিক বিজ্ঞানীরা একে ছদ্মবিজ্ঞান বলে অভিহিত করেছেন।বিখ্যাত বিজ্ঞানী কার্ল সাগান তাঁর বই ‘The Demon-Haunted World’-এ দেখিয়েছেন জ্যোতিষবিদ্যার কোনো পরীক্ষামূলক ভিত্তি নেই।
মনোবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন মানুষ এমন ভবিষ্যদ্বাণীগুলো বিশ্বাস করে যা খুব সাধারণ এবং সবার জন্য প্রযোজ্য। এটি বার্নাম প্রভাব (Barnum Effect) নামে পরিচিত।জ্যোতিষবিদ্যা সম্পর্কিত গবেষণায় দেখা গেছে যে, জন্মছক এবং ভবিষ্যদ্বাণী মেলানোর ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক মিল নেই।যদিও বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে জ্যোতিষবিদ্যা প্রশ্নবিদ্ধ। তবে এটি আজও বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। অনেক মানুষ এটি বিশ্বাস করেন এবং দৈনন্দিন জীবনে অনুসরণ করেন। বিশেষ করে ভারত, বাংলাদেশ, চীন, এবং পশ্চিমা দেশগুলোতে রাশিফল, গণনা ও জ্যোতিষ পরামর্শ জনপ্রিয়।
অনেকে বিয়ে, চাকরি, ব্যবসা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে জ্যোতিষ পরামর্শ গ্রহণ করতে পছন্দ করেন। মিডিয়ায় দৈনিক রাশিফল ও জ্যোতিষচর্চার বিভিন্ন অনুষ্ঠান জনপ্রিয়। অনেক মানুষ বিশ্বাস করে জ্যোতিষবিদ্যা মানসিক স্বস্তি প্রদান করতে পারে।জ্যোতিষবিদ্যা ইতিহাস ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও বৈজ্ঞানিকভাবে এটি গ্রহণযোগ্য নয়। যদিও এটি অনেকের জন্য মানসিক প্রশান্তি ও ব্যক্তিগত দিকনির্দেশনা দেয় তবুও এর ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব হিসেবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


