আদি শঙ্করের দর্শনে – ‘আমি কে?’ এই প্রশ্নের সহজ কিন্তু গভীর উত্তর

ভাবুন আপনি একটা স্বপ্ন দেখছেন। স্বপ্নে আপনি পাহাড়ে উঠছেন, নিচে নেমে আসছেন, ভয় পাচ্ছেন, আনন্দ পাচ্ছেন। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। আপনি বুঝতে পারেন সব কিছু কল্পনা ছিল, আপনি আসলে নিজের বিছানাতেই আছেন। কিন্তু স্বপ্নটা কি পুরোপুরি মিথ্যা ছিল? নাকি কোনো সত্যও তার পেছনে লুকিয়ে ছিল?

আদি শঙ্করের দর্শন এই প্রশ্নটির গভীরে যায়। তিনি বলেন, আমাদের এই জাগতিক জীবনটিও একধরনের “মায়া”, একটি বিভ্রম। এবং এর পেছনে রয়েছে একটি চরম সত্য, ব্রহ্ম। এই ব্রহ্মই আমাদের আসল পরিচয়। এই ভাবনাটিই “অদ্বৈত বেদান্ত” নামে পরিচিত।

আদি শঙ্কর ছিলেন ৮ম শতাব্দী’র একজন বিশিষ্ট দার্শনিক ও সাধক, যিনি ভারতীয় দর্শনের অদ্বৈত শাখাকে একটি সুসংহত ও যুক্তিনিষ্ঠ কাঠামো দেন।তিনি বলেছিলেন, আত্মা (অর্থাৎ ‘আমি’) এবং ব্রহ্ম (সর্বব্যাপী চেতনা বা ঈশ্বর) এক ও অভিন্ন। একজন পথিক যেমন তার পথ ভুলে শহরের গলিতে হারিয়ে যায়, তেমনি আমরা আমাদের সত্য পরিচয় ভুলে গেছি জাগতিক পরিচয়ের জালে। শঙ্করের দর্শন হলো এই ভুল চেনাকে ভাঙা, এই বিভ্রম থেকে জাগা।

শঙ্করের মতে, আমরা জগৎকে যেভাবে দেখি তা একধরনের মায়া। কিন্তু মায়া মানে কেবল মিথ্যা নয়। বরং এটা সত্য আর মিথ্যার মাঝখানের এক ঘোলাটে স্তর যা সত্যকে আড়াল করে রাখে, আবার সত্যের ইঙ্গিতও দেয়।

যেমন ধরুন, আপনি দূর থেকে একটা দড়ি দেখলেন এবং ভয় পেয়ে ভাবলেন এটি সাপ। পরে কাছে গিয়ে দেখলেন, সেটি আসলে দড়ি। এখানেও আপনি কিছু দেখেছেন, কিছু অনুভব করেছেন—কিন্তু ভুল বুঝেছেন। এই দড়ি-সাপের উপমাই শঙ্কর ব্যবহার করেন বোঝাতে, আমরা জগতকে যেমন দেখি, তেমনটি তা নয়। কিন্তু এই জগত সম্পূর্ণ মিথ্যাও নয়, কারণ একে দেখার জন্য কোনো না কোনো ভিত্তি তো থাকতেই হয়। সেই ভিত্তিই হলো ব্রহ্ম।

আমরা যখন নিজের মধ্যে ঢুকি সব অনুভব, চিন্তা, ইচ্ছার পেছনে যে চেতনা কাজ করে, সেটিই ব্রহ্ম। এই চেতনা কখনো বদলায় না, জন্মেও না, মরে না।শঙ্করের ভাষায়, “জগত পরিবর্তনশীল, কিন্তু চেতনা অপরিবর্তনীয়। এটাই একমাত্র বাস্তব।” শঙ্করের দর্শনে তাই ঈশ্বর, আত্মা ও জগতের বিভেদ অপ্রয়োজনীয়। আমরা যেমন সমুদ্রে ঢেউ দেখি—তবে জানি ঢেউ, ফেনা, জলোচ্ছ্বাস—সবই আসলে জল, তেমনি আমাদেরও সার সত্য একটাই, চেতনাময় ব্রহ্ম।

শঙ্কর তর্ক করেন, কিন্তু সেটা কেবল যুক্তির খাতিরে নয় তাঁর যুক্তি সবসময় অভিজ্ঞতার দিকে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, আপনি কেবল বই পড়ে বা গুরুকে শুনে সত্যকে বুঝবেন না, আপনাকে নিজের ভেতর ডুব দিতে হবে।

এই উপলব্ধির পথ হলো “জ্ঞানযোগ” বা আত্মানুসন্ধানের পথ। তিনি বলেন, “যতক্ষণ তুমি মনে করো তুমি শরীর, মন, পরিচয়, ততক্ষণ তুমি তোমার মূল সত্য ভুলে আছো।” এই ভুল ভাঙতে লাগে প্রশ্ন, “আমি কে?”—এ প্রশ্নই মুক্তির দিকচিহ্ন।

এই দর্শন আমাদের জীবনে কী দেয়?
ভাবতে পারেন “এই দর্শন আমার জীবনে কী কাজে আসবে?” চলুন সহজ উদাহরণে যাই। ধরা যাক, আপনি খুব দুঃখী, চাকরি হারিয়েছেন, সম্পর্ক ভেঙেছে।আপনি যদি ভাবেন আপনার পরিচয় এই চাকরি বা এই সম্পর্ক তাহলে আপনি নিজেকেও হারাবেন। কিন্তু যদি আপনি বুঝেন, “আমি সেই চেতনা, যার অভ্যন্তরে এই অভিজ্ঞতাগুলো ঘটছে” তাহলে আপনি দুঃখের মাঝে থেকেও অটুট থাকবেন।

শঙ্কর বলেন, “তুমি যা নও, তা আঁকড়ে ধরো না।” নিজের অভ্যন্তরে থাকা সেই নিরবিচল চেতনাকে চিনলে জীবন বদলাতে বাধ্য।

আদি শঙ্করের দর্শন কোনো ধর্মীয় ঘেরাটোপ নয়, বরং এটি একটি অভ্যন্তরীণ বিপ্লব। যেখানে “আমি” বলতে আমরা যা বুঝি, তা চূর্ণ হয়ে যায় এবং উঠে আসে একটি চিরন্তন, নির্বিকল্প চেতনার অনুভব। এই দর্শন আমাদের শেখায়, সত্যের জন্য বাইরের জগত নয়, নিজের ভেতরেই যেতে হবে। কারণ আমরা যে চেতনাকে খুঁজছি, সেই চেতনা দিয়েই তো আমরা খুঁজছি!

শঙ্করের অদ্বৈত দর্শন আমাদের শেখায়, জগত এক, সত্য এক, এবং আমরাও সেই একেরই প্রতিফলন। দুঃখ, ভয়, বিভেদ সবই অজ্ঞানতার ফল। আর এই জ্ঞানেই রয়েছে মুক্তি, যা কোনো গ্রন্থ নয়, কোনো গুরুও নয় আপনার নিজের ভেতরের জ্যোতির আলোয় উদ্ভাসিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন