দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপে শুরু হয়েছে এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (APEC)-এর প্রস্তুতিমূলক দ্বিতীয় উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক। এবারের সম্মেলনকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে কারণ বৈশ্বিক অর্থনীতি এখন এক জটিল ও অনিশ্চিত সময় অতিক্রম করছে। বাণিজ্য যুদ্ধ, সরবরাহ শৃঙ্খলের ভাঙন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রযুক্তিগত বিপ্লবের যুগে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য।
১৯৮৯ সালে গঠিত APEC বর্তমানে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ২১টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত একটি অর্থনৈতিক ফোরাম। এই ফোরামের সদস্য দেশগুলো সম্মিলিতভাবে বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৬০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের ৪৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
বর্তমানে চীন-যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক বিরোধ, বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ অর্থনৈতিক প্রভাব এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগ—এই সবকিছুই এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
এবারের জেজু বৈঠকে দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনামসহ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর উচ্চ পর্যায়ের অর্থনৈতিক প্রতিনিধি ও নীতিনির্ধারকরা অংশ নিচ্ছেন। বৈঠকটির মূল প্রতিপাদ্য “Resilient Cooperation for Sustainable and Inclusive Growth”— অর্থাৎ স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য দৃঢ় সহযোগিতা।
মূল আলোচ্য বিষয়ে রয়েছে আন্তঃদেশীয় শুল্ক কমানো, ডিজিটাল বাণিজ্য উন্নয়ন এবং এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা) খাতকে শক্তিশালী করা।
বিশেষ করে “Asia-Pacific Free Trade Area (FTAAP)” পরিকল্পনাকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে।
সদস্য রাষ্ট্রগুলো ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে সমন্বিত উদ্যোগের কথা বলছে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগ এবং সবুজ অবকাঠামো উন্নয়নে যৌথ তহবিল গঠনের প্রস্তাব রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্লকচেইন এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা— এই তিন খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গৃহীত হচ্ছে।
‘Cross-Border Data Flow’ সহজীকরণ এবং সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা নির্ধারণও আলোচনায় এসেছে।
উন্নয়নশীল সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো অন্যতম এজেন্ডা।
যদিও বাংলাদেশ APEC-এর সদস্য নয়, তবুও এই ফোরামের সিদ্ধান্ত দক্ষিণ এশিয়া ও বৃহত্তর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে সরাসরি প্রভাব ফেলে। APEC-এর উদ্যোগে আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও সবুজ অর্থনীতি বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য পরোক্ষ সুযোগ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার সাথে বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে APEC-এর নীতিনির্ধারণী দিকনির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ।
জেজু বৈঠক শুধু সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণ নয় বরং সামগ্রিকভাবে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ কাঠামো গঠনের সূচনা। বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষিতে শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আঞ্চলিক সহযোগিতা সময়ের দাবি। এ ধরনের উদ্যোগ এশিয়ার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক বাণিজ্য পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।


