বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা অন্যতম আলোচিত ও উদ্বেগজনক বিষয়। সম্প্রতি বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) এবং যুক্তরাজ্যের মেট অফিস প্রকাশিত এক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে পৃথিবী আরও রেকর্ড-ভাঙা উষ্ণতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। এই উষ্ণতা মানবসভ্যতা, প্রকৃতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী ২০২৪ সাল ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে অন্তত একটি বছর ২০২৪ সালের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যাবে—এমন সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো ৭০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে যে, এই পাঁচ বছরের গড় তাপমাত্রা প্যারিস চুক্তিতে নির্ধারিত ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমা অতিক্রম করবে। অথচ ২০১৫ সালে এই চুক্তির মাধ্যমে বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন। জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা, তেল, গ্যাস) পোড়ানো, বন উজাড়, শিল্পকারখানার বর্জ্য ইত্যাদির কারণে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইডের মতো গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এগুলো সূর্যের তাপ আটকে রাখে এবং পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়িয়ে তোলে। এছাড়া এল নিনো বা লা নিনা জাতীয় প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্রও সাময়িকভাবে উষ্ণতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে, তবে মূলত দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য মানুষই দায়ী।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রতিটি দশমিক ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা ও দাবানল বাড়ছে, প্রবল বর্ষণ ও বন্যার ঘটনা বাড়ছে, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ও টাইফুনের ঝুঁকি বাড়ছে, আর্কটিক অঞ্চলে বরফ দ্রুত গলছে, ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে, পানির সংকট ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এসব পরিবর্তনের ফলে কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি ও বন্যা, খরা এবং লবণাক্ততার কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় ও নিম্নাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষি, মৎস্য, স্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, আগামী পাঁচ বছরে এসব সমস্যা আরও বাড়বে এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এজন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, বন সংরক্ষণ ও পুনঃবনায়ন করতে হবে, শিল্প ও পরিবহন খাতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও জীবনধারা গ্রহণ করতে হবে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও নীতিমালা জোরদার করতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তন মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। আগামী পাঁচ বছরে যদি বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস সত্যি হয়, তাহলে পৃথিবী আরও চরম আবহাওয়া ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে।


