আকিরা কুরোসাওয়ার “Throne of Blood” সবরকম শ্রেণিবদ্ধতার বাইরে : ডেরেক ম্যালকম, চলচ্চিত্র সমালোচক, দ্য গার্ডিয়ান

একজন পরিচালকের কোন চলচ্চিত্রটি তাকে সর্বোত্তমভাবে উপস্থাপন করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সময়ই কঠিন। ১০০ সেরা পরিচালকের তালিকা তৈরি করা যতটা সহজ, তাদের কোন চলচ্চিত্রটি নির্বাচন করা হবে, সেটা অনেক বেশি জটিল। প্রয়াত আকিরা কুরোসাওয়া নিঃসন্দেহে এখনো জাপানি পরিচালকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিত নাম। অথচ তাঁর সমতুল্য বা তাঁর চেয়েও বড় মাপের নির্মাতা মিকিও নারুসে, ইয়াসুজিরো ওজু কিংবা কেনজি মিজোগুচি তাঁরা কেবল চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের কাছেই পরিচিত।

তবে কোন চলচ্চিত্রটি কুরোসাওয়ার শিল্পকর্মের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা উচিত? বেশিরভাগ মানুষ বলবেন, হয় The Seven Samurai, সেই মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র যা জন স্টারজেসের The Magnificent Seven-কে অনুপ্রাণিত করেছিল; কিংবা Rashomon, সেই চলচ্চিত্র যা ১৯৫১ সালের ভেনিস ফেস্টিভ্যালে পশ্চিমা দর্শকদের স্তম্ভিত করে দিয়েছিল, কারণ সেখানে একটি খুনের ঘটনাকে বিভিন্ন সাক্ষীর ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা হয়; অথবা Ikiru (Living), যেখানে এক ক্যানসার আক্রান্ত সরকারি কর্মচারী জীবনের মানে খুঁজে পাওয়ার জন্য একটি বস্তি এলাকায় শিশুদের জন্য খেলার মাঠ গড়ে তোলে, এটি একটি বিষণ্ন অথচ মানবিক গল্প।

এই প্রতিটি সিনেমাই একটি করে মাস্টারপিস এবং এর বাইরেও কুরোসাওয়ার অনেক চমৎকার কাজ আছে। তবে আমার ব্যক্তিগত পছন্দ Throne of Blood (১৯৫৭), যা শেক্সপিয়ারের Macbeth নাটকের একটি জাপানি রূপান্তর। এখানে ‘স্কটিশ নাটক’টি রূপ নেয় একটি চমৎকার ভিজ্যুয়াল অভিব্যক্তিতে, যা জাপানি যোদ্ধা-ঐতিহ্যের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এটি ছিল টি. এস. এলিয়টের প্রিয় চলচ্চিত্র। এই নাট্যরূপটি মিতব্যয়ী, সংলাপ নয় বরং ধীরে গড়ে ওঠা ঘটনার বিস্তারে দৃশ্যগুলো বলিষ্ঠ হয়ে ওঠে। চরিত্রচিত্রণ হয়তো শেক্সপিয়ারের মতো সূক্ষ্ম নয়, কিন্তু সন্দেহ নেই, কবি হয়তো কবরেও এই কাজ দেখে বিরক্ত হতেন না। কুরোসাওয়ার নিজস্ব ভাষা শেক্সপিয়ারের ভাষার সঙ্গে এতটাই শক্তভাবে মিলেমিশে গেছে যে এটা এমনকি ভার্দির সঙ্গীতায়োজিত Macbeth-কেও ছাপিয়ে যায়।

চলচ্চিত্রের শুরুতেই আমরা দেখি কুরোসাওয়ার ম্যাকবেথ চরিত্র ওয়াশিজু (তাঁর প্রিয় অভিনেতা তোশিরো মিফুনে অভিনীত) ও মিকি কুয়াশা ও বৃষ্টিভেজা পাইন বনের মধ্যে দিয়ে ঘোড়া চড়ে যাচ্ছেন জাদুকরী নারীর (এখানে মাত্র একজন) সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে।

তাঁরা যখন ফিরে আসেন, তখন দর্শক হিসেবে আমরাও ঠিক বুঝে উঠতে পারি না তারা কোথায়। তারা ক্যামেরার দিকে বারবার এগিয়ে আসে, মোট বারোবার, আবার ফিরে যায়, যেন কোনো অদৃশ্য প্রতিবন্ধক তাদের আটকে রেখেছে। অবশেষে তারা এক সমতলভূমিতে পৌঁছায়, যেখান থেকে তারা যুদ্ধবাজ রাজপ্রাসাদ দেখতে পায়। এটা এতটাই সাহসী ও অভিনব নির্মাণ—আমি এরকম দৃশ্য আগে বা পরে আর কোথাও দেখিনি। ক্যামেরা ট্র্যাকিংয়ের এমন নিখুঁত ব্যবহার খুব কমই দেখা গেছে।

তবে এসব কারিগরি কৌশল কখনো নিজেকে জাহির করে না, বরং নাটকীয়তা তৈরি করে। যেমন, যখন ওয়াশিজু দেখে ‘কবওয়েব ফরেস্ট’ (শেক্সপিয়ারের ‘বারনাম উড’) ধীরে ধীরে তার দুর্গের দিকে এগিয়ে আসছে, অথবা যখন যুদ্ধ শেষে প্রতিশোধপরায়ণ সৈন্যদের তীর তার দেহে আঘাত হেনে বারবার তাকে ক্রুশবিদ্ধ করছে।

চলচ্চিত্রটি কখনো মৃত্যুসম নীরবতায় থেমে থাকে, কখনো প্রবল সহিংসতার বিস্ফোরণে কাঁপিয়ে তোলে এবং এর মধ্য দিয়ে নাটকটি শুধু শেক্সপিয়ারের কঙ্কালরূপ ধারণ করে না, বরং জাপানি ‘নো’ নাট্যের বৈশিষ্ট্যও ধারণ করে। লেডি ম্যাকবেথরূপী আসাজির সাদা মুখ যেন শুরু থেকেই তাঁকে ভূতের মতো করে তোলে; মিকির ঘোড়ার আতঙ্কিত আচরণ, তার মৃত্যুর মুহূর্তটিকে চোখের আড়াল করেও দর্শকের সামনে আনে; রাজসিংহাসনে বসা ঘরে হঠাৎ পাখির ঝাঁকের প্রবেশ কিংবা ধীরে ধীরে দুর্গের দিকে এগিয়ে আসা শবযাত্রা সবই যেন অনিবার্য ধ্বংসের পূর্বাভাস।

অনেকে কুরোসাওয়াকে ‘সবচেয়ে পাশ্চাত্যঘেঁষা’ জাপানি পরিচালক হিসেবে সমালোচনা করেছে, আবার প্রশংসাও করেছে এই জন্য যে তিনি পশ্চিমা দর্শকদের কাছে বোধগম্য। জাপানিরাও একসময় তাঁর কাজকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, বলেছিল তিনি যেন পুরনো ও অব্যবহারযোগ্য ঐতিহ্যের প্রতি অতিমাত্রায় আসক্ত।

এই সমালোচনা ও কাজ চালিয়ে যাওয়ার অসম্ভব চেষ্টার ফলে কুরোসাওয়া ১৯৭১ সালে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে স্পিলবার্গ, জর্জ লুকাসসহ অনেক পশ্চিমা নির্মাতার সহায়তায় তিনি আবার চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করতে সক্ষম হন, তাঁদের চোখে তিনি ছিলেন এক প্রকার পূর্বের ডেভিড লিন। কুরোসাওয়ার অনেক সিনেমার তুলনায় Throne of Blood সবচেয়ে ভালোভাবে দেখায় যে, পশ্চিমা প্রভাব গ্রহণ করলেও (যেমন: পশ্চিমা আর্ট স্কুলে আঁকা শেখা বা জন ফোর্ডের প্রতি মুগ্ধতা), তবু তিনি মিজোগুচির মতোই জাপানি ঐতিহ্যেরই সন্তান।

তবে চলচ্চিত্র হিসেবে Throne of Blood কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণিতে ফেলা যায় না। এটি ভিজ্যুয়াল শক্তির এক অনন্য নিদর্শন, যা জাপানি অনুভূতির গভীরতায় ভরপুর এবং সম্ভবত পর্দায় নির্মিত শ্রেষ্ঠ শেক্সপিয়ার রূপান্তর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন