বাংলাদেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বতী সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করার পর দলটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যম বা গণমাধ্যমে কতটা লেখা বা বলা যাবে এনিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সোমবার প্রকাশিত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, গণহত্যায় অভিযুক্ত দলটির নেতাকর্মীদের বিচারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দেশের ভেতরে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের যে কোনো ধরনের “প্রকাশনা, গণমাধ্যম, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা, মিছিল, সভা-সমাবেশ, সম্মেলন আয়োজনসহ যাবতীয় কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো”।
আইনজীবীরা বলছেন, যে আইনের ক্ষমতাবলে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেটির পরিধি বিস্তৃত এবং কিছু বিষয় স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা নেই। ফলে আইনটির অপব্যবহার হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
বাংলাদেশে সন্ত্রাস বিরোধী আইনটি করা হয়েছিলো ২০০৯ সালে। এতে ‘সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত ব্যক্তি বা সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার’ বিধান যুক্ত করে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করেছে সরকার।
ওই আইনের ২০ নং ধারার ‘ঙ’ উপধারায় বলা হয়েছে, “নিষিদ্ধ সত্তা কর্তৃক বা উহার পক্ষে বা সমর্থনে যে কোনো প্রেস বিবৃতির প্রকাশনা, মুদ্রণ বা প্রচারণা, সংবাদ সম্মেলন বা জনসম্মুখে বক্তৃতা প্রদান নিষিদ্ধ করিবে।”
ঠিক কী ধরনের বক্তব্য প্রকাশ করা যাবে অথবা কোন ধরনের বক্তব্য প্রকাশিত হলে সেটি নিষিদ্ধ সত্তার ‘পক্ষে বা সমর্থনে’ গেছে বলে বিবেচনা করা হবে, আইনে সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার পর বিষয়টি নিয়ে জনমনে ধোঁয়াশা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টি সামনে আসায় ওই দিনই প্রজ্ঞাপনের বিষয়ে ব্যাখ্যা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।
সোমবার মধ্যরাতে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, “…এই নিষেধাজ্ঞা সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মী ও সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য হবে। উক্ত প্রজ্ঞাপন অন্য কোনো রাজনৈতিক দল বা মুক্তমতের মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করে না। আওয়ামী লীগ, এর কোনো কর্মকাণ্ড, দলটি সম্পর্কে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের যৌক্তিক, গঠনমূলক বা আইনানুগ বিশ্লেষণ বা মতামত প্রদান এই প্রজ্ঞাপন দ্বারা খর্বিত করা হয়নি।”
এক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য ও মতামত তো বটেই, গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরেও আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে জানাচ্ছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন।
“এখন যদি ষাটের দশকের বা একাত্তরের আওয়ামী লীগের ইতিবাচক ভূমিকা ও ইতিহাস নিয়ে যদি গণমাধ্যমে বা অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বক্তব্য বা বিবৃতি, লেখা বা যে কোনো প্রচারণা প্রকাশ করা হয় — সেটাও কি এর মধ্যে পড়ে যাবে কি-না এগুলো স্পষ্ট করা প্রয়োজন,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
“এমনকি, সরকারের পক্ষ থেকে এই যে যৌক্তিক ও গঠনমূলক বিশ্লেষণের কথা বলা হচ্ছে; কে ঠিক করবে কোনটা যৌক্তিক বা গঠনমূলক, আর কোনটা যৌক্তিক নয়?” — প্রশ্ন রাখেন সারা হোসেন।
আইনের এমন অস্পষ্টটার কারণে অপপ্রয়োগের ঝুঁকিও রয়েছে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। আইনজ্ঞরা বলছেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ সত্ত্বাকে সমর্থন করে কোনো বক্তব্য দিলে বা প্রচারণা চালালে একজন ব্যক্তির সর্বনিম্ন দুই বছর থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত সাজা এবং আর্থিক জরিমানা হতে পারে।


