আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী দুটি কিস্তি (চতুর্থ ও পঞ্চম) পাওয়ার শর্ত পূরণে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি আইএমএফের একটি মিশনের পর্যালোচনায় এ তথ্য উঠে এসেছে। মিশন জানায়, রাজস্ব আয়ের নিম্ন প্রবৃদ্ধি, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার বাস্তবায়নে ব্যর্থতা, ভর্তুকি না কমানো এবং ব্যাংক খাতের কাঙ্ক্ষিত সংস্কার না হওয়াই এ পিছিয়ে পড়ার প্রধান কারণ। ৬ এপ্রিল থেকে দুই সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করে আইএমএফ প্রতিনিধি দলটি সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। এরপর গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এক ব্রিফিংয়ে মিশনপ্রধান ক্রিস পাপাজর্জিও এসব তথ্য জানান। যদিও মিশন এখনো কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে চূড়ান্ত মত দেয়নি, তবে বলেছে—যদি বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় অগ্রগতি দেখাতে পারে, তবে ২০২৫ সালের জুনের শেষ দিকে দুটি কিস্তির অর্থ ছাড় হতে পারে।
আইএমএফ ব্রিফিংয়ে জানায়, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতি চ্যালেঞ্জের মুখে। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৩.৩ শতাংশ, যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৫.১ শতাংশ। এই পতনের পেছনে রাজনৈতিক অস্থিরতা, কঠোর অর্থনৈতিক নীতিমালা ও বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমেছে—১১.৭ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ৯.৪ শতাংশে, যা এখনো বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার (৫–৬ শতাংশ) চেয়ে অনেক বেশি ।অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আইএমএফ আরও নমনীয় বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং শক্তিশালী রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়েছে। মিশনের মতে, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার অর্থনীতিকে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে সহায়তা করবে।
রাজস্ব খাতে আইএমএফ বলেছে—বাংলাদেশের জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার অত্যন্ত কম। তারা কর প্রশাসন ও নীতির মধ্যে স্বচ্ছ পার্থক্য আনার সুপারিশ করেছে। করছাড় কমানো, কর কাঠামো সহজীকরণ এবং একটি টেকসই রাজস্ব বৃদ্ধির কৌশলপত্র প্রণয়নের আহ্বান জানায় সংস্থাটি। এর মাধ্যমে সরকার সামাজিক ও অবকাঠামো খাতে ব্যয় করতে পারবে, যা অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি মজবুত করবে। ব্যাংক খাত সংস্কারের ক্ষেত্রেও আইএমএফ বেশ কড়াকড়ি অবস্থানে রয়েছে। তারা বলেছে, ব্যাংক খাতে আইনগত সংস্কার, সম্পদের মান নির্ধারণে স্বচ্ছতা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। একইসঙ্গে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে আরও সক্রিয় হতে হবে। তারা খেলাপি ঋণ কমানো, দুর্বল তদারকি মোকাবিলা এবং নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা বলেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায়ও আইএমএফ অর্থনৈতিক প্রস্তুতি ও টেকসই অবকাঠামো বিনিয়োগের ওপর জোর দিয়েছে। আইএমএফ মনে করে, শুধু পরিকল্পনা নয়, বাস্তবায়নের দৃঢ়তা ও ধারাবাহিকতাও উন্নয়নের পূর্বশর্ত। ঋণ কিস্তির অগ্রগতি বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে ক্রিস পাপাজর্জিও বলেন, রাজস্ব আয়, বিনিময় হার ও ব্যাংক খাত—এই তিনটি বিষয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আলোচনায় এসেছে। তবে আলোচনা এখনো চলছে এবং আরও আলোচনা হবে ওয়াশিংটনে ২১ থেকে ২৬ এপ্রিল অনুষ্ঠেয় আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বসন্তকালীন বৈঠকে।
বাংলাদেশ ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। প্রথম তিন কিস্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে মোট ২৩১ কোটি ডলার। এখন বাকি আছে আরও ২৩৯ কোটি ডলার। অর্থনীতিবিদদের মতে, আইএমএফের ঋণ শুধু আর্থিক সহযোগিতা নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক নীতির প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থার প্রতীক। আইএমএফ কিস্তি না ছাড়লে অন্যান্য দাতা সংস্থাও নিরুৎসাহিত হতে পারে । বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আইএমএফের শর্ত পূরণে ৭৫ শতাংশ অগ্রগতি থাকলেও চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ১০০ শতাংশ পূরণ প্রয়োজন হয়। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “আমার মনে হয় না, কিস্তি একেবারে আটকে যাবে। ব্যাংক খাতে কিছু অগ্রগতি নিয়ে তারা খুশি।” আগামী মে মাসে আইএমএফের আরেকটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে আসবে। তখন শর্ত পূরণের অগ্রগতি এবং কিস্তি ছাড়ের সম্ভাব্যতা নিয়ে আরও সুস্পষ্ট বার্তা পাওয়া যেতে পারে।


