বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ মানুষের জীবনযাত্রাকে পরিবর্তিত করে চলেছে। স্মার্টফোনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যেমন গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে, তেমনি সেটি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার প্রধান হাতিয়ারও বটে। এর মধ্যে অ্যাপল কোম্পানির ফেস আইডি (Face ID) প্রযুক্তি একটি যুগান্তকারী উদ্ভাবন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই প্রযুক্তি কেবল ফোন আনলক করার পদ্ধতি নয়, এটি আধুনিক বায়োমেট্রিক সুরক্ষারও নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
অ্যাপল প্রথমবার ২০১৭ সালে iPhone X মোবাইলে ফেস আইডি চালু করে। এটি একটি বায়োমেট্রিক অথেন্টিকেশন পদ্ধতি, যেখানে ব্যবহারকারীর মুখের ভৌতিক এবং কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে ফোন আনলক করা হয়। ফেস আইডি ৩০,০০০ টিরও বেশি ইনফ্রারেড পয়েন্ট ব্যবহার করে মুখের গভীরতার ম্যাপ তৈরি করে, যা ৩ডি ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে সত্যিকারের মুখ চিনতে সক্ষম। এই পদ্ধতিটি ক্যামেরা ও সেন্সরের সংমিশ্রণে কাজ করে, যার মধ্যে রয়েছে ইনফ্রারেড ক্যামেরা, ডিপথ সেন্সর, ফ্লাড ইলিউমিনেটর ইত্যাদি।
ফেস আইডি-র সবচেয়ে বড় শক্তি হল এটি মাত্র ০.০১ সেকেন্ডে কাজ সম্পন্ন করতে পারে এবং প্রচণ্ড অন্ধকারেও সঠিকভাবে মুখ চিনতে সক্ষম। এটি ফটোকপি বা দুই মাত্রিক ছবি দ্বারা প্রতারিত হওয়া প্রায় অসম্ভব। এর পাশাপাশি এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফোনের স্ক্রিন অ্যানিমেশনকে সামঞ্জস্য করে, যেমন ব্যবহারকারীর দৃষ্টি নজর রাখে, তাই কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত চোখের দিকে ফোন খোলে না।
ফেস আইডি বায়োমেট্রিক তথ্যকে একটি নিরাপদ এলাকা হিসেবে ‘সিকিউর এনক্লেভ’ (Secure Enclave) এ সংরক্ষণ করে, যা ফোনের প্রসেসর থেকে আলাদা এবং কোনো অ্যাপ বা অপারেটিং সিস্টেম সরাসরি এক্সেস করতে পারে না। এর ফলে ব্যবহারকারীর তথ্য লিক হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই।
অ্যাপল দাবি করে যে ফেস আইডি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত ডাটা কোনো ক্লাউডে আপলোড করে না, অর্থাৎ সব তথ্য ফোনের ভিতরেই নিরাপদ থাকে।এর ফলে গোপনীয়তা রক্ষা হয় এবং ডেটা চুরির ঝুঁকি কমে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ফেস আইডির সাথে আনলকের সম্ভাব্য ভুল মিলের হার ১-মিলিয়নে ১, অর্থাৎ অত্যন্ত নিরাপদ। তুলনামূলকভাবে পুরানো টাচ আইডি পদ্ধতির ভুল মিলের হার ছিল ৫০,০০০-এ ১।
তবে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে, যেমন যমজ ভাইবোন বা গ্লাস, মাস্ক ব্যবহারের সময় ফেস আইডি সঠিকভাবে কাজ নাও করতে পারে। তবে অ্যাপল নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেটের মাধ্যমে এই সীমাবদ্ধতাগুলোও কমানোর চেষ্টা করছে।
ফেস আইডি ব্যবহারকারীদের জন্য অনেক সুবিধা নিয়ে এসেছে। এটি ফোন আনলক করা সহজ করে তোলে, কারণ এখন পাসওয়ার্ড বা প্যাটার্ন মনে রাখার প্রয়োজন কমে গেছে। মোবাইলে লেনদেন বা পেমেন্টের ক্ষেত্রেও ফেস আইডি দ্রুত অথেন্টিকেশন দেয়, ফলে নিরাপত্তার সঙ্গে ব্যবহারকারীর সময় বাঁচে।
বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় মুখ ঢেকে মাস্ক ব্যবহারের কারণে ফেস আইডির সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও, অ্যাপল দ্রুত আপডেট চালু করে মাস্ক পরেও আইফোন আনলকের ব্যবস্থা করেছে, যা ব্যবহারকারীদের জন্য দারুণ সুবিধাজনক হয়েছে।
ফেস আইডি প্রযুক্তি শুধুমাত্র স্মার্টফোনে সীমাবদ্ধ নয়। ভবিষ্যতে এটি অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস, যেমন ল্যাপটপ, স্মার্ট হোম ডিভাইস ও ব্যাংকিং সিকিউরিটিতে ব্যবহৃত হতে পারে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও মেশিন লার্নিংয়ের সংমিশ্রণে এটি আরও উন্নত এবং ব্যবহারকারীর মুখের স্বাভাবিক পরিবর্তন যেমন বয়স, চুলের স্টাইল ইত্যাদি সহজে বুঝতে সক্ষম হবে।


