২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মধ্যযুগীয় গবেষণায় ‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ শব্দটি নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক অ্যাংলো-স্যাক্সনিস্টস সোসাইটির নাম পরিবর্তনের দাবির মাধ্যমে এই বিতর্কের সূত্রপাত হলেও দ্রুত তা আরও বিস্তৃত ও তীব্র আকার ধারণ করে। বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল এই শব্দটির বর্ণবাদী ও লিঙ্গবৈষম্যমূলক ব্যবহার এবং এর প্রভাব। অনেকেই দাবি করেন, ‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ শব্দটি বাদ দিলে গবেষণায় বৈষম্যের সুযোগ কমে যাবে এবং ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যা থেকে মুক্তি মিলবে। অন্যদিকে অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদ মনে করেন, এই শব্দটি যথাযথ ও সতর্ক ব্যবহারে বর্ণবাদী অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব এবং এটি ইতিহাস বোঝার জন্য অপরিহার্য।
‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ শব্দটি মূলত ইংল্যান্ডের প্রাচীন মধ্যযুগীয় সময়কাল (৫০০ থেকে ১০৬৬ খ্রিস্টাব্দ) বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। তবে আধুনিক সময়ে বিশেষ করে উত্তর আমেরিকায় এই শব্দটি সাদা supremacist গোষ্ঠীর কাছে একটি রাজনৈতিক ও বর্ণবাদী প্রতীক হয়ে উঠেছে। তারা এই শব্দের মাধ্যমে ইংল্যান্ডের ‘স্বর্ণযুগ’ এবং ‘জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব’ প্রমোট করে। এর ফলে অনেকেই এই শব্দের ব্যবহার বন্ধ করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।
২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক অ্যাংলো-স্যাক্সনিস্টস সোসাইটি নাম পরিবর্তন করে ‘ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর দ্য স্টাডি অফ আর্লি মেডিভাল ইংল্যান্ড’ নামে পরিচিত হয়। এই পরিবর্তনকে অনেকেই বর্ণবাদ ও লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন। কিন্তু কিছু গবেষক মনে করেন, এই পরিবর্তন ইতিহাসের জটিলতা ও বৈচিত্র্যকে উপেক্ষা করে এবং গবেষণার স্বাধীনতায় বাধা দেয়।
‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ শব্দটির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ৮ম শতকে ইতালির পল দ্য ডিকনের ‘হিস্ট্রি অফ দ্য লম্বার্ডস’ গ্রন্থে। ইংল্যান্ডে এটি sporadically ব্যবহৃত হয় ৯ম থেকে ১১শ শতকের মধ্যে। ১৮-১৯শ শতকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য গবেষকরা এই শব্দটি পুনরুজ্জীবিত করেন ইংল্যান্ডের জাতিগত ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস বোঝাতে। তখন থেকে এটি ইংল্যান্ডের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
প্রত্নতত্ত্বের ক্ষেত্রে ‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ শব্দটি ৫ম থেকে ১১শ শতকের ইংল্যান্ডের বসতি, সমাধি, ধাতব কাজ, মুদ্রা এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক নিদর্শন বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এটি কোনো নির্দিষ্ট জাতিগত গোষ্ঠীকে নির্দেশ করে না, বরং ঐ সময়ের বিভিন্ন রাজ্য ও সম্প্রদায়ের বহুমাত্রিক ইতিহাস তুলে ধরে। প্রত্নতত্ত্ববিদরা এটিকে একটি নিরপেক্ষ ও প্রায়োগিক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করেন, যা ঐ সময়ের জটিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন বোঝাতে সাহায্য করে।
‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ শব্দটি বহু সময় ধরেই জাতীয়তাবাদী ও বর্ণবাদী মতাদর্শের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষ করে ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাদা supremacist গোষ্ঠী এই শব্দকে ইংল্যান্ডের ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে উপস্থাপন করে, যা তাদের জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে সমর্থন করে। এই কারণে অনেকেই এই শব্দের ব্যবহার বন্ধের পক্ষে।
তবে আধুনিক গবেষণায় স্পষ্ট হয়েছে যে অ্যাংলো-স্যাক্সনরা কোনো একক ‘বর্ণগত’ গোষ্ঠী ছিল না। বরং এটি ছিল বিভিন্ন জার্মানিক জনগোষ্ঠীর একটি জটিল ও পরিবর্তনশীল সমন্বয়, যারা ৫ম শতকে রোমান ব্রিটেনের পতনের পর ধীরে ধীরে ইংল্যান্ডে বসতি স্থাপন করে। এই সময়ে স্থানীয় রোমান-ব্রিটিশ জনগণও ছিল এবং তারা নতুন আগতদের সঙ্গে বিভিন্ন মাত্রায় মিশে গিয়েছিল। তাই আধুনিক বর্ণগত ধারণা এই যুগের জন্য প্রযোজ্য নয়।
১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে অ্যাংলো-স্যাক্সন প্রত্নতত্ত্বে নতুন প্রশ্ন ও পদ্ধতি এসেছে। এখন গবেষকরা শুধু বসতি বা সমাধির নিদর্শন খুঁজে পাওয়ার চেয়ে বেশি গভীরভাবে সমাজের গঠন, রাজনৈতিক কাঠামো, অর্থনীতি, ধর্মীয় রূপান্তর এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে কাজ করেন। এছাড়া ভাইকিং আক্রমণ, রাজ্য গঠন, খ্রিস্টান রূপান্তর ইত্যাদি বিষয়েও ব্যাপক গবেষণা চলছে।
বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্প যেমন সাটন হু, লিনডিসফার্ন, রেন্ডলশ্যাম ইত্যাদি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছে। এইসব প্রকল্পে ‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ শব্দটি ব্যবহার করে ঐ সময়ের জটিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া বোঝানো হয়।
ব্রিটেনের বিভিন্ন জাদুঘর, দর্শনীয় স্থান, শিক্ষামূলক প্রকল্প ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ শব্দটি ব্যবহার করে ইতিহাসকে সহজ ও আকর্ষণীয় করে তুলে ধরে। সাটন হু, লিনডিসফার্ন, ওয়েস্ট স্টো, জ্যারো হল ইত্যাদি দর্শনীয় স্থানগুলোতে এই শব্দের মাধ্যমে ইতিহাসের নানা দিক তুলে ধরা হয়। এছাড়া অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ব্লগ, সোশ্যাল মিডিয়া ও পাবলিক আর্কিওলজি প্রকল্পগুলোতেও এই শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এটি সাধারণ মানুষকে প্রাচীন ইংল্যান্ডের ইতিহাসের সঙ্গে সংযুক্ত করে এবং তাদের মধ্যে ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ায়।
‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন এই শব্দটি জাতীয়তাবাদী ও বর্ণবাদী মতাদর্শের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এবং এটি ব্যবহার করলে ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যা ছড়াতে পারে। আবার কেউ মনে করেন, ‘প্রারম্ভিক ইংরেজ’ বা ‘পুরানো ইংরেজ’ শব্দগুলো ভাষাগত ও জাতিগত বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে।
‘অ্যাংলো-স্যাক্সন’ শব্দটি মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডের ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যদিও এর ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবুও এটি ইতিহাস বোঝার জন্য অপরিহার্য। বর্ণবাদী ও জাতীয়তাবাদী অপব্যবহার প্রতিরোধে শব্দটির সতর্ক ও সমালোচনামূলক ব্যবহারই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
আমাদের উচিত এই শব্দের ইতিহাস, ব্যবহার ও প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং এর মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈচিত্র্যময় গবেষণা পরিবেশ গড়ে তোলা। এটি শুধুমাত্র একাডেমিক ক্ষেত্রেই নয়, সমাজের বিভিন্ন স্তরে ইতিহাসের সঠিক ও সমৃদ্ধ বোধ গড়ে তুলতেও সহায়ক হবে।


