অস্তিত্ববাদ শুধু দর্শনের একটি শাখা নয়। এটি ব্যক্তিস্বাধীনতা, সংকট এবং অস্তিত্বের অর্থ খোঁজার এক অক্লান্ত প্রচেষ্টা। জাঁ-পল সার্ত, আলবেয়ার কামু ও ফ্রিডরিখ নীরে মতো দার্শনিকরা অস্তিত্ববাদকে চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে এনেছেন। তাদের মতে, মানুষ জন্মগতভাবে কোনো নির্ধারিত উদ্দেশ্য নিয়ে আসে না বরং তার জীবনকে অর্থবহ করে তোলার দায়িত্ব তার নিজের। অস্তিত্ববাদী দর্শনের মূল মন্ত্র স্বাধীনতা ও দায়িত্ব। সাত্রের মতে মানুষ পুরোপুরি স্বাধীন। কিন্তু সেই স্বাধীনতার ভারও তাকে বহন করতে হয়।সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণ দায়ভার ব্যক্তির নিজের ওপরেই বর্তায়। জীবন অর্থহীন, কিন্তু অর্থকে সৃষ্টি করতে হয়!
নিঃসঙ্গতা ও আত্ম-অনুসন্ধান নিয়ে নী েবলেছিলেন, ‘ঈশ্বর মৃত’, অর্থাৎ ধর্ম বা প্রচলিত মূল্যবোধ মানুষকে আর পথ দেখাতে পারবে না। প্রত্যেক ব্যক্তিকেই তার নিজ নিজ অস্তিত্বের অর্থ খুঁজে বের করতে হবে। জাঁ-পল সার্ভে অস্তিত্ববাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিকদের একজন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “Being and Nothingness” (১৯৪৩) এ তিনি ব্যাখ্যা করেন, মানুষ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয় এবং তার অস্তিত্বের জন্য নিজেই দায়ী। তাঁর নাটক “No Exit” এর বিখ্যাত উক্তি “Hell is other people” এটি অস্তিত্ববাদী নিঃসঙ্গতার ধারণার অন্যতম চিত্র! সাত্র বলেন, “অস্তিত্ব সবার আগে, তারপর আসে সারবস্তু।” অর্থাৎ মানুষ জন্মগ্রহণ করার পর তার জীবনযাত্রা এবং সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তাকে তার সত্তাকে সংজ্ঞায়িত করতে হয়।
তাঁর আরেকটি বিখ্যাত রচনা “Nausea” (১৯৩৮)-এ অস্তিত্ববাদী অনুভূতির গভীরতা চিত্রিত হয়েছে। যেখানে প্রধান চরিত্র রোকোয়েন্টিন সবসময় তার আশেপাশের জগতের প্রতি এক ধরনের বিতৃষ্ণা ও শূন্যতা অনুভব করে। কামু নিজেকে ‘অ্যাবসার্ডবাদী’ বলে দাবী করতেন। তাঁর বিখ্যাত রচনা “The Myth of Sisyphus” (১৯৪২)-এ তিনি ব্যাখ্যা করেন, জীবন অর্থহীন হলেও মানুষকে তা মেনে নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। তিনি মনে করেন, মানুষকে “অ্যাবসার্ড নায়ক” হতে হবে। যে জীবনের অর্থহীনতাকে জেনেও বিদ্রোহ করবে!
তাঁর উপন্যাস “The Stranger” (১৯৪২)-এ মঁসিয়ে মের্সো নামের চরিত্রটি অস্তিত্ববাদী সংকটের প্রতিচিত্র। সে সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধকে অস্বীকার করে এবং নিজের নিয়তির প্রতি উদাসীন থাকে।
কামুর “The Plague” (১৯৪৭) উপন্যাসে একদল মানুষের গল্প তুলে ধরা হয়, যারা মহামারির সময়ে জীবনের অর্থ খুঁজতে চায়। এটিও অস্তিত্ববাদী এবং অ্যাবসার্ডবাদী চিন্তার মিশ্রণ। নীল্সে অস্তিত্ববাদের অন্যতম পূর্বসূরী। বিখ্যাত গ্রন্থ “Thus Spoke Zarathustra” (১৮৮৩-১৮৯১)-তে তিনি “Übermensch” বা “অধিমানব”-এর ধারণা দেন, যেখানে তিনি বলেন যে মানুষকে প্রচলিত নৈতিকতা ও ধর্মের বাইরে গিয়েই নিজের শক্তি ও মূল্যবোধ তৈরি করতে হবে। তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো “God is dead” (ঈশ্বর মৃত), যা “The Gay Science” (১৮৮২)-এ পাওয়া যায়। এর সার অর্থ আধুনিক সমাজে ধর্মের প্রভাব কমছে এবং মানুষকে নিজের জীবনদর্শন গড়ে তুলতে হবে।
নীতুসের “Beyond Good and Evil” (১৮৮৬) গ্রন্থে প্রচলিত নৈতিকতার সমালোচনা করা হয়েছে, যেখানে তিনি বলেছেন, সমাজ আমাদের উপরে যে নৈতিকতার চাপ সৃষ্টি করে তা আসলে আমাদের স্বাধীনতা সীমিত করে। অস্তিত্ববাদের কেন্দ্রীয় ধারণাগুলোর মধ্যে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বলে, প্রতিটি মানুষ অনন্য এবং তার জীবনযাত্রা তার নিজের হাতে। অস্তিত্ববাদীরা মনে করেন, বিশ্বে কোনো অন্তর্নিহিত অর্থ নেই। মানুষকে নিজস্ব অর্থ তৈরি করতে হয়। ব্যক্তি স্বাধীন হলেও তার সিদ্ধান্তের দায়ও তাকেই নিতে হয়। অনেক অস্তিত্ববাদী দার্শনিক মনে করেন, জীবনের অর্থহীনতা শুরুতে হতাশাজনক মনে হলেও এটি অনেক সময় মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বারও খুলে দেয়।
কামুর মতে, মানুষ যখন জীবনের অর্থহীনতাকে মেনে নিতে পারে, তখন সে তার জীবনকে নিজের মতো করে ভিন্ন এক ধাঁচে গড়ে তুলতেও পারে। বাস্তব জীবনে অস্তিত্ববাদের সাধারণ উদাহরণ দিতে গেলে কর্মজীবনে আমরা কেন একটি নির্দিষ্ট পেশা বেছে নিই? এটি কি সমাজ নির্ধারিত নাকি আমাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত? অস্তিত্ববাদ বলে, আমাদের ক্যারিয়ারের অর্থ ও দিকনির্দেশনা গুলো আমাদের নিজেদেরই নির্ধারণ করতে হবে। আমরা অনেক সময় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সমূহ থেকে অর্থ খুঁজে ফিরি। এখানে কিন্তু অস্তিত্ববাদ বলে, সম্পর্ক আমাদের কোনো অস্তিত্বের সংজ্ঞা দিতে পারে না। আমাদের নিজেদের জীবন আমরা নিজেরাই গঠন করি।
অস্তিত্ববাদ আমাদের শেখায় সমাজের অবাঞ্ছিত চাপ উপেক্ষা করে নিজেরাই নিজেদের জীবনদর্শন গড়ে তোলা সম্ভব। বাংলা সাহিত্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “অরণ্যের দিনরাত্রি” ও সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রগুলোতে অস্তিত্ববাদী চেতনা প্রকাশিত হয়েছে। অস্তিত্ববাদ শুধু একটি দার্শনিক মতবাদ নয়, আমাদের বাস্তব জীবনবোধ। এটি মানুষকে স্বাধীনতার মূল্য উপলব্ধি করায়, জীবনকে নিজস্বভাবে গড়ে তোলার পথ দেখায়। সাত্র, কামু ও নীরে মতো দার্শনিকরা দেখিয়েছেন, জীবন নিজে থেকে কোনো অর্থ বহন করে না। মানুষকেই তার জীবনের মানে নির্ধারণ করতে হয়। জীবন কি অর্থহীন, নাকি আমাদের তৈরি অর্থেপূর্ণ? উত্তর খুঁজতে হবে আমাদেরই।


