গত কয়েক বছর ধরেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence বা AI) আমাদের দৈনন্দিন জীবনে একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ছবি আঁকা থেকে শুরু করে গান রচনা, এমনকি লেখালেখি পর্যন্ত AI এখন সৃজনশীল ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে। তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে এক জটিল ও বিতর্কিত বিষয়, কপিরাইট আইন ও ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় AI এর কপিরাইট ব্যবহারের ওপর নতুন একটি আইন প্রস্তাব হয়েছে, যা ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
এই প্রস্তাবিত আইনে AI নির্মাতা সংস্থাগুলোকে কনটেন্ট নির্মাতাদের অনুমতি ছাড়াই তাদের কাজ ব্যবহার করার অধিকার দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ যেসব শিল্পী, লেখক, ফটোগ্রাফার কিংবা অন্যান্য সৃষ্টিশীল পেশাজীবী তাদের তৈরি কনটেন্ট AI মডেলগুলোকে প্রশিক্ষণে ব্যবহার করলেও তারা কোনও স্বীকৃতি বা পারিশ্রমিক পাবেন না। এই আইনের পক্ষে এবং বিপক্ষে বিভিন্ন মতামত উঠে এসেছে এবং জনমত জরিপে দেখা গেছে ৭৪ শতাংশ মানুষ এই আইনের বিরোধিতা করছে।
AI মডেলগুলো সঠিকভাবে কাজ করতে প্রচুর পরিমাণে ডেটা প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে “মেশিন লার্নিং” মডেলগুলোকে হাজার হাজার বা লক্ষ লক্ষ ছবি, লেখা, ভিডিও ইত্যাদি দিয়ে প্রশিক্ষিত করতে হয়। এই ডেটা সংগ্রহের ক্ষেত্রে অনেক সময় ব্যবহার হয় কপিরাইটযুক্ত কনটেন্টের, যা মূল নির্মাতাদের অধিকার লঙ্ঘন করে।
অনেকে যুক্তি দেন, কপিরাইট সৃষ্টিকর্তাদের সম্মতি ছাড়া ডেটা ব্যবহার করলে তা তাদের আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ AI যখন তাঁদের কাজ থেকে শেখে, তখন সে ভবিষ্যতে সেই কাজের অনুরূপ কনটেন্ট তৈরি করতে পারে, যা সৃষ্টিকর্তার নিজস্ব কপিরাইট বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া সৃষ্টিশীলতা ও মৌলিকত্বের প্রশ্নও উঠে আসে।
অস্ট্রেলিয়ান সরকার ও AI শিল্পের একাংশ মনে করে, নতুন আইন AI এর উন্নয়নে বাধা কমাবে। কারণ ডেটার সহজলভ্যতা AI মডেলকে উন্নত ও সঠিক করতে সাহায্য করে। তারা বলছেন, AI সৃষ্টিশীলতার নতুন ধারা সৃষ্টি করছে এবং এই প্রযুক্তির প্রবৃদ্ধি থামানো বা নিয়ন্ত্রণ কঠিন। তাই এই আইনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের জন্য কপিরাইট কনটেন্ট ব্যবহারে সহজতা এনে দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নিশ্চিত করা হবে।
আইন প্রস্তাবকারীরা আরও বলেন, এটি আন্তর্জাতিক প্রবণতার সঙ্গে খাপ খায়, যেখানে অনেক দেশে AI ও কপিরাইট ব্যবহারে কিছুটা উদার নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে। সরকারের উদ্দেশ্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও বাণিজ্যকে প্রাধান্য দেওয়া।
অন্যদিকে শিল্পী, লেখক ও সৃষ্টিশীল পেশাজীবীদের সংগঠন এই আইনের কঠোর বিরোধিতা করছে। তাদের যুক্তি, এই আইন হলে সৃষ্টিকর্তাদের অধিকার ও মৌলিক কাজের মূল্যায়ন হ্রাস পাবে। শিল্পীদের উপর অর্থনৈতিক চাপ পড়বে এবং সৃষ্টিশীলতা হ্রাস পেতে পারে। তাছাড়া যদি AI মডেলগুলোর প্রশিক্ষণে অনুমতি ছাড়াই কনটেন্ট ব্যবহার করা হয়, তাহলে কে ক্ষতিপূরণ দেবে?
সৃষ্টিশীল পেশাজীবীদের আয় ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। অনেক শিল্পী দাবি করছেন, AI সংস্থাগুলোকে অবশ্যই পারিশ্রমিক দেওয়া উচিত, কারণ তারা তাঁদের কাজ ব্যবহার করছে এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ কনটেন্ট তৈরি করবে।
জরিপে ৭৪% মানুষ এই আইনের বিরোধিতা করে বলেছেন, “সৃষ্টিকর্তাদের সম্মতি ছাড়া তাদের কাজ ব্যবহারের অধিকার AI কোম্পানির নেই।” এর ফলে সরকার ও আইন প্রণেতাদের উপর চাপ পড়েছে নতুন সমঝোতা ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা গড়ার জন্য।
অস্ট্রেলিয়ার এই আইনি বিতর্ক আসলে বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি ও কপিরাইট আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে AI ও কপিরাইট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা ও আইন প্রণয়ন চলছে।
অনেকে মনে করেন, AI প্রযুক্তিকে নিয়মিত এবং সুষ্ঠু করার জন্য একটি “ফেয়ার ইউজ” বা ন্যায়সঙ্গত ব্যবহারের নীতিমালা জরুরি, যা সৃষ্টিকর্তাদের অধিকার ও AI এর উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করবে।


